মেডিকেল কলেজের মূল ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে পেখম গভীর একটা শ্বাস নেয়। যেনো বুকের ভেতর জমে থাকা ধুলো গুলোকে একবারে ছুঁড়ে ফেলে দিতে চায় সে। কাঁধে একটা ভারি ব্যাগ, চোখেমুখে ক্লান্তি আর একটা দৃঢ় স্থিরতা। আবারো সেই প্রথম দিনের মতো নতুন যাত্রা। এবার শুধু নিজের জন্য। কারো ছায়া ছাড়াই সে আগাবে। কোনো বাঁধা তাকে ছুঁতে পারবে না। আবারো একটা লম্বা শ্বাস ফেলে পা বাড়ালো। মাঠ পেরিয়ে যখন ক্লাসরুমের দিকে পা বাড়ায়, চারপাশের মুখগুলো যেনো এক একটা অচেনা গল্প। কেউ জোরে হাসছে, কেউ ছবি তুলছে, কেউ ফোনে ব্যস্ত। কারো মুখেই নেই সেই ব্যথার ছাপ যা ও বয়ে বেড়াচ্ছে প্রতিটি শিরায়।
পেখম চুপচাপ বসে পড়ে এক কোণে। ছায়া ঘেরা জানালার পাশে। হঠাৎ এক মেয়ে পাশে এসে বসে। তারপর মিষ্টি গলায় প্রশ্ন করল,
“হাই আমি মিমিয়া. তোমার নাম?”
“পেখম।”
আর কিছু বলেনা সে। কিন্তু মিমিয়া হাসিমুখে আবারো বলল,
“তোমার চোখে অদ্ভুত একটা দৃষ্টি আছে। খুব একা একা মনে হচ্ছে তোমায়।”
পেখম একটু হাসে। অস্বস্তি ঢাকতে সে ব্যাগ খুলে বই বের করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মিমিয়া নীরব চোখে দেখে ভাবল পেখম আপতত কথা বলতে চাইছে না তাই নিজেও পেখমকে বিরক্ত করা ছেড়ে দিয়ে ক্লাসে মন দিলো।
“আজ নতুন করে আবারো জীবন শুরু করলাম। কিন্তু আমার ভেতরটা এখনও ভয় পায়। সবকিছু ভেঙে গড়েছি আবার। তবুও কেন যেনো… মনে হয়, আমি প্রস্তুত নই। এই শহরের বাতাসে এখনো তোমার গন্ধ। মাঝে মাঝে যা আমায় শ্বাসরুদ্ধ করে। নিজের শরীরটা যেমন নতুন পথের যাত্রী, আত্মাটা এখনও কুন্ঠিত। একজন মেয়ের ভাঙা আত্মবিশ্বাস যখন ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে, তখন একাকীত্বই হয়ত তার সবচেয়ে বড় সঙ্গী।”
ডায়রিতে টুকটুক করে এগুলো লিখে ডায়েরিটা আবারো বন্ধ করে ফেলল পেখম তারপর চেয়ারেই শরীর এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করল। খানিকবাদেই সেই চেয়ারেই পেখমকে নিদ্রা হানা দিলো।
দিন যত গড়ায়, পেখম ক্লাসে মন দেয়। এনাটমির বইয়ে চোখ রাখে, টিচারের লেকচার খাতায় তুলে রাখে—কিন্তু মন কি থাকে ওখানে? একবার হঠাৎ কোথাও ক্লাসে “ম্যারেজ এন্ড রিলেশনশিপ স্ট্রেস”-এর ওপর ছোট্ট আলোচনা হয়। শিক্ষক বললেন,
“কখনো কখনো জীবনে কিছু ভুল হয়ে যায়, কিন্তু সেটা ভুল থেকে শেখা না হলে তা আবারও ফিরে আসে। নিজেকে ভালোবাসতে না পারলে কেউ আপনাকে ভালোবাসবে না।”
পেখম এক মুহূর্ত চুপ করে থাকে। সেই কথাগুলো যেন কারো কণ্ঠে না, তার নিজের ভেতর থেকে ভেসে আসছে।
এক সন্ধ্যায় পেখম হলের ছাদে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। মাথার ওপর রঙ বদলানো আকাশ, আর বুকের ভেতর জমে থাকা অস্পষ্ট কান্না। হঠাৎ ফোনে একটা কল আসে পল্লবী বেগমের।
পেখম সহজ গলায় জবাব করল,
“আমি ঠিক আছি। শুধু মাঝে মাঝে… মনে হয়, আমি কাউকে কিছুই বোঝাতে পারি না।”
“পেখম…”
“না, থাক। আমি ভালো থাকবো। আজ না হয়, চুপচাপ আকাশটাই আমার কথা শুনুক।”
হতাশ হলো পল্লবী বেগম। মেয়েটার সারা জীবন তিনি নিজে নষ্ট করেছেন এই আফসোস সে কখনোই কমাতে পারবেন না। তার কাছে যদি কোনো ম্যাজিক থাকত তাহলে তিনি এই সব ঘুচিয়ে দিতেন।
সেদিন মিমিয়া ল্যাবে কিছু একটা করছিলো। পেখম পাশে থাকলেও কোনো কিছুতে সেদিন মনোযোগ দিতে পারছে না। তাই মিমিয়া পেখমকে হুট করেই বলল,
“তুই খুব সিরিয়াস। জীবন তোকে হয়তো খুব ঠকিয়েছে। কিন্তু জানিস? ঠকে গেলে মানুষ ভয় পায় আবার ভরসা করতে। কিন্তু সবার মতোই তোকে আবার হাসতে শিখতে হবে।”
পেখম একটু হেসে জবাব দিলো,
“হয়তো… একদিন অথবা ধীরে। এখনো আমি হাঁটতে শিখছি একদম নতুন করে।”
তারপর আবারো একটি নতুন সকাল। নতুন শহর। নতুন পরিচয়। নতুন যুদ্ধ। আর পুরনো হৃদয়ে লুকানো কিছু না-বলা ক্লান্তি।
পেখম আজ মেডিকেল কলেজে তার দ্বিতীয় বর্ষের প্রথম ক্লাসে যাচ্ছে। ড্রেসটা পরতে গিয়ে আড়ষ্ট লাগে নিজেকে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয়, নতুন পোশাকে পুরনো আত্মা। তবু সেই আত্মাকে গুটিয়ে নিয়ে একটা খাঁচার মতো বুকের ভেতর রেখে সে বেরিয়ে পড়ে।
মেডিকেল কলেজ চত্বরে আজ নবীনদের আনাগোনা। আলো-ছায়ায় ঢাকা পথগুলো যেন কেবল অন্যদের জন্য। পেখম নিজের বুকটাকে শক্ত করে ক্লাসরুমে পা রাখে।
জানালার পাশে একটি খালি চেয়ারে বসে। কারো চোখে চোখ না রেখে। কিছু সময় পরই মিমিয়া আসে। মিমিয়া নামের মেয়েটি একটি উচ্ছল মেয়ে। তবুও পেখম এখনোতার কাছে ইজি হতে পারে নি আর না, নিজের ভিতরের দরজাটা খুলে দিতে পেরেছি। মিমিয়া সব সময় ভাবে পেখম হয়তো স্রেফ শান্ত। কিন্তু পেখম জানে, সে কোনো শোকগ্রস্ত, ভয়ধরা, সদ্য ফিনিক্স হয়ে ওঠা একজন মানুষ।
হলরুমে ফিরে বই নিয়ে বসে পেখম। ল্যাম্পের আলোয় বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টায় ঠিকই, কিন্তু মনে শুধু হেঁটে বেড়ায় সেইসব মুহূর্ত, যা সে ফেলে এসেছে। কখনো সৌজন্যের কণ্ঠস্বর, কখনো আনিয়ার মুখ। কখনো স্পর্শকাতর সেই ছবি। কখনো রাতের মতো নীরব এক স্পর্শ… সব একাকার। পেখকের কপালের উপর দিয়ে চুল সরে গেলে, সে নিজের অজান্তেই বলে ফেলল,
“আমি বাঁচতে চাই, কিন্তু ভয় পাই।
নিজের কাছেই আজকাল অপরিচিত লাগে নিজেকে।”
“ডাক্তারি পড়তে এসেছি—মানুষকে সারাবো বলে। কিন্তু নিজেরই চিকিৎসা চলছে যেন প্রতিটি ক্লাসে, প্রতিটি ঘুমহীন রাতে।
যে ঘরটায় একা একা ঘুমাই, সেই ঘরটাই যেন একটা বিশাল হাসপাতালের আইসোলেশন রুম। সেখানে কেবল আমি আর আমার না-বলা যন্ত্রণা। নিরাময়ের আশা নিয়ে আমি বেঁচে আছি।”
ধুপ করে আবারো ডায়েরিটা বন্ধ হয়। আর জায়গা নেয় হল রুমের নিজের বেডের বালিশের নিচে।
রাতের কোনো এক সময়, ক্যাম্পাসের বাইরে পার্কিং এরিয়ায় একটা কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকে কিছুটা দূরে। গাড়ির ভেতরে বসে থাকা মানুষটির চোখ কেবল একটাই দিকে। ছোট জানালার এক কোনায় বসে থাকা মেয়েটির দিকে। মেয়েটি হয়ত বই পড়ছে। নওশির অদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। তার মাঝে প্রতিক্রিয়া নেই। কোনো পদক্ষেপ নেই। কোনো চেষ্টা নেই, তার সামনে যাওয়ার। শুধু এক দৃষ্টি রাখে মেয়েটির পানে।। তার ফোনে কেউ একটা মেসেজ পাঠিয়েছে,
“সি’জ সেফ।”
নওশির চোখ বন্ধ করে গাড়ির সিটে হেলান দেয় তারপর এক নিঃশ্বাসে বলে ওঠে,
“তাই হোক। সে যেন সুস্থ থাকে। এইটুকুই চাই।”
তার পাশের সিটে পড়ে থাকা পুরনো একটা ছবি, পেখম আর নওশির, এক কটেজের চা-পানের মুহূর্তে, অস্পষ্ট হাসিতে ধরা। ছবিটা সে আবার গ্লাভ বক্সে ঢুকিয়ে দেয়। গাড়ির জানালায় তখন ছায়ার মতো পেখমের অবয়ব, সে জানে না, কেউ তাকে ঠিক এই মুহূর্তে খুব কাছে থেকে দেখছে। কিন্তু কখনো সামনে আসবে না। নওশির জানে, এখন নয়। নওশিরের ছমাস শেষ হবার পরও সে এই দেশে। তাবে সে খুব শিগগিরই পেখমের সামনে যাবে। সময় এসেছে…
পেখম হোস্টেলের বিছানায় শুয়ে আছে। পাশে বই, চোখ বন্ধ। তার ভিতরে এখনও তোলপাড় চলে। কিন্তু আজ একটু স্বস্তি, আজকে নিজেকে একটু জড়িয়ে ধরতে পেরেছে সে নতুন করে গড়ার প্রথম ধাপ যেন পেরিয়ে এসেছে। তার কাছে মনে হচ্ছে, এ জীবনে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নিজেকে ভালোবাসা। নিজেকে ভালোবাসার মধ্যে কোনো স্বার্থপরতা নেই তাই সে বিরবির করে বলল,
“নিজের মধ্যে বেঁচে থাকার জন্যই এবার এই যুদ্ধ। কাউকে জিতিয়ে নয়, এবার নিজেকে নিয়ে জিততে চাই।”
বাইরের আকাশে হালকা বৃষ্টি নামে। পেখম জানে না, তার ঝড় এখনো শেষ হয়নি। কিন্তু সে জানে, এবার আর পালিয়ে যাবে না।
__প্রথম পরিচ্ছদ এর সমাপ্তি“
- প্রানেশা আহসান শীতল
[২য় পরিচ্ছদ] “সেদিন ও তুমি”


![নবোঢ়া: আগুনফুলের আত্মনিবেদন [পর্ব ৬২]](https://amarlekha.com/wp-content/uploads/2025/05/IMG_20250529_231033.jpg)
![মেঘের দেশে প্রেমের বাড়ি [শেষ পর্ব]](https://amarlekha.com/wp-content/uploads/2025/10/3cf51236-2d29-45c2-a963-4d58a217fde2.jpg)
![অটবী সুখ [পর্ব-০১]](https://amarlekha.com/wp-content/uploads/2025/11/aa823019-ffef-4aa7-9651-89294bd4fbe2.jpg)
![প্রজাপতি আমরা দুজন [পর্ব-০৮]](https://amarlekha.com/wp-content/uploads/2025/07/photo_6212761625384044921_y.jpg)