সেদিন ও সে [২য় পরিচ্ছদ]
পেখম ক্লাস থেকে বের হতেই মিমিয়া পিছনে থাকা মেয়ে গুলোর দিকে চোখ রাঙ্গিয়ে তাকাতেই মেয়ে গুলো চুপ হয়ে জোরপূর্বক হাসলো। মিমিয়া বিরক্ত মুখে বলল, “তোদের ককোনো কাজ নেই সারাদিন পেখমের পেছনে লেগে থাকিস। সমস্যা কি বলবি আমায়?”
সামিয়া মুখ ফুলিয়ে বলল, “সমস্যা নেই। আমরা যা সন্দেহ করছি তা সত্যি না হলেই তো হয়।”
“কি সন্দেহ করছিস। আর সাজেকের কথা উঠে কোথা থেকে। পেখম সাজেক ট্যুর দিয়েছিলো এখানে ভর্তি হবারও আগে। তোরা আমায় একটু বুঝিয়ে বলবি?”
নীলিমা বিরক্ত হয় তারপর বলে, “আমি ভর্তি হবার আগে পরিবারের সাথে সাজেক গিয়েছিলাম।”
মিমিয়াও জিজ্ঞেস করল, “হ্যাঁ। তো?”
“তুই বিশ্বাস করবি না। আমিও প্রথমে বিশ্বাস করছিলাম না। এর জন্যই নওশির স্যারকে দেখার পর আমার মনে হচ্ছিলো আমি তাকে কোথায় দেখেছি। আর আজকে সকালে যখন ক্লাসে আসছিলাম তখন দেখলাম স্যার দ্বিতীয় তলা থেকে নিচে দাঁড়ানো পেখমকে দেখছিলো। আমিও কৌতুহলবশত অনেকটা সময় তাকিয়ে দেখার পর মনে পড়লো, আমি তাকে সাজেক দেখেছিলাম। আর শুধু তাই-ই নয়! ওয়েট——
এতোটুকু বলেই নিজের ফোন বের করে, অনেক খোঁজা খুঁজিতে পুরণো কয়েকটা ছবি খুঁজে বের করল নীলিমা। তারপর মিমিয়ার দিকে ফোন এগিয়ে দিয়ে বলল, ” এর পর তুই দেখ।”
মিমিয়া ফোন নিয়ে ছবি গুলো জুম করে দেখলো। অদ্ভুত ভাবে ওইখানে চারটা ছবিতে নওশির আর পেখম দুইজনেই উপস্থিত। এই ছবি দেখে হতভম্ব মুখে মিমিয়া বলল, “এটা অসম্ভব।”
সামিয়া মুখের উপর বলল, “আমরা শুনেছি পেখমের ডিভোর্স হয়েছে। আর ওর স্বামী কে বা তার নাম কি আমরা জানি না। আর এখানের ছবি দেখে মনে হচ্ছে ওরা ভালোই পরিচিত। আর স্যার ক্লাসে পেখমকে যেভাবে বকাঝকা করে। আর পেখমও পালাই পালাই করে। এমনও হতে পারে নওশির স্যার পেখমের এক্স হাসবেন্ড?”
মেয়েরা চকিতে সামিয়ার দিকে তাকায়। তারপর বলল, “ঠিক-ই তো। আমাদের তো মাথাই আসেনি।”
মিমিয়া গভীর মনোযোগ সহকারে সব শুনার পর কিছু একটা ভাবলো। তারপর বলল, “তবুও এমন নাও হতে পারে। তুই এক কাজ কর নীলা, এই ছবি গুলো আমায় সেন্ড কর। আমি ব্যাপারটা দেখছি। আর এই ব্যাপারে কাউকে বলার দরকার নেই। আজ পেখম এই ধরনের একটা সিচুয়েশন সার্ভাইব করে এসেছে। এমনও তো হতে পারতো ওর বদলে আমাদের কারো সাথে এমন হতো। তাই একটু মানবিক হ। আর ওকে সাপোর্ট কর। ওকে নিয়ে আর গসিপ করিস না। ও নিজেকে অনেক সামলেছে। শুধু ও কারো সাথে মেশে না বা কথা বলে না তাই বলে ওকে নরম ভাবিস না। আর না ও বোকা। ও শুধু একটু শান্তি চায়। তাই দয়া করে পারলে ওকে একটু শান্তি তে থাকতে দে। নাহলে নিজেদের মতো থাক ওকে বিরক্ত করিস না।”
মেয়েরা নিজেদের ভুল বুঝতে পারলো। আসলেই পেখম একটা মারাত্মক সিচুয়েশনে পড়ে এইখানে এসেছে। তাই বলে ওকে বুলি করা একদমই উচিত নয়। আবার নওশিরের কেয়ারিং দিক গুলোও অদেখা নয়। কিন্তু তাই বলে একটা ভিক্টিমকে এভাবে টর্চার করা উচিত না। তাই নিজেদের সামলে নিয়ে ক্লাসের উপস্থিত মেয়েরা মিমিয়ার কাছে পেখমের থেকে ক্ষমা চাইলো। আর মিমিয়াও ওদের বুঝাতে পেরে বলল, “আমরা সাথে থাকলেই পেখম এসব জিনিস থেকে সার্ভাইব করতে পারবে। শুধু খেয়াল রাখবি আমাদের ক্লাসোর বাহিরেও যেন পেখমকে কেউ ডিস্টার্ব না করে।”
“খেয়াল রাখবো।”
~~~~~
সম্পূর্ণ খালি ফ্ল্যাটটায় পা দিতেই শরীরটা কেমন নির্জীব হয়ে ওঠলো। সাথে একাকিত্ব বোধ জাপ্টে ধরলো পেখমকে। পেখম হাতের ব্যাগ টা আর এপ্রোনটা সোফার উপর রেখে অন্য সোফায় টানটান হয়ে শুয়ে পড়লো। খনিকের মধ্যে আধোঘুম চোখে নেমে এলো। ঠিক কতটা সময় ঘুমিয়েছে পেখম জানে না। বাসার কলিংবেলের শব্দে ঘুম ভাঙ্গতেই পাশ থেকে ওড়না তুলে তা শরীরে জড়িয়ে নিয়ে দরজা খুলতেই মিমিয়ার মুখ সামনে এলো। পেখম অবাক মুখে জিজ্ঞেস করল, “তুই এখানে?”
“তোর সাথে কিছু কথা আছে।”
“বল!”
“ভেতরে এসে বলব। এখন সামনে থেকে সর।”
কথাটুকু বলেই ড্রইংরুমে এসে মিমিয়া পেখমের দিকে তাকিয়ে বলল, “এখনো এখানেই ঘুমাস?”
“হুম!”
“তিনটা বছর ধরেই দেখছি সোফায় ঘুমাচ্ছিস। বিছানায় তো ঘুমাবি না। তাহলে এতো বড় ফ্ল্যাট দিয়েই কি করিস।”
“এখানেই ভালো লাগে। তুই বল, কি এমন গুরুত্বপূর্ণ কথা।”
পেখমের কথা শেষ হতেই তার ফোনে মেসেজের টোন এলো। মিমিয়া বলল,”চেক কর।”
পেখম ফোন তুলে ছবি গুলো দেখে বলল, “এইটা তো আমাদের ক্লাসের নীলিমার ছবি।”
“হ্যাঁ। জুম করে পিছনে দেখ। প্রতিটা ছবিই দেখবি।”
পেখম প্রথমে কিছু বুঝতে না পাড়লেও ছবি জুম করার সাথে সাথেই বোকার মতো ঢোক গিলে মিমিয়ার দিকে তাকায়। মিমিয়াও বলল, “এখানে ঠিক কি হয়েছে আমায় বলবি! ক্লাসের মেয়েরা ভাবছে তুই নওশিরের স্যারের এক্স ওয়াইফ। আর তোদের নীলিমা সাজেক দেখেছে। তাই এমনও নয় এগুলো মিথ্যা তাই যা হয়েছে। একদম প্রথম থেকে বল, আমি আগে জানতে চাইনি। কিন্তু এগুলো এখন একপ্রকার মাথাব্যাথা হয়ে উঠেছে। আমি চাই না তুই আর কোনো ঝামেলার মুখোমুখি হস।”
এতোটুকু বলেই মিমিয়া লম্বা শ্বাস ফেলল। তারপর বলল, “খেয়েছিস কিছু?”
“না।”
“তাহলে আমি রান্না বসাই। আর তুই আমায় সব বল।”
পেখম লম্বা শ্বাস ফেলে বলল, “আচ্ছা।”
মিমিয়া মিষ্টি করে হাসলো তারপর রান্না ঘরে এসে আগে ফ্রিজ থেকে মাংস নামিয়ে ভিজিয়ে ভাত বসালো। তারপর সবজি কাটতে কাটতে পেখমের দিকে তাকিয়ে বলল, “এবার বল।”
“আমার এক্স হাসবেন্ডের নাম সৌজন্য। আম্মুর ফ্রেন্ডের বোনের ছেলে ওই লোক। যার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে।”
“এগুলো আমি জানি। আমি শুধু জিজ্ঞেস করেছি। নওশির স্যার আর তোর ব্যাপারে। আর সাজেকের ব্যাপারে।”
মাথা নাড়ায় পেখম তারপর বলল, “ড. আশরিয়াল নওশির আমার চাচাতো ভাই।”
“কিইই!”
থতমত গলায় চেঁচিয়ে উঠল মিমিয়া। পেখম এখনো সহজ চোখে তাকিয়ে আছে। মিমিয়ার যেনো বিশ্বাস হচ্ছে না। তাই ফের জিজ্ঞেস করল, “কি বললি তুই!”
“যা শুনেছিস। উনি আমার কাজিন। আর আমাদের বংশের প্রথম ছেলে।”
“তুই বিদেশী?”
পেখম ঢোক গিলল তারপর মাথা নাড়িয়ে সায় জানায়। মিমিয়া এখনো বোকার মতো তাকিয়ে বলল, “তুই আর কি কি লুকিয়েছিস আমার কাছ থেকে তা বল।”
পেখম মৃদু হাসল। তারপর বলল, আমার জীবনের সেরা প্রাপ্তির মাঝে তুই একজন মিমিয়া। আমি ভাবতাম আমার ব্যাপারে তুই সব জানলে আমায় নিজে মজা নিবি। কিন্তু আমি সব সময়ই ভুল ছিলাম। আর তুই সব সময়ই আমায় প্রটেক্ট করেছিস। তাই আমি কখনো ঘুরে ওদের কাউকে জবাব দেবার প্রয়োজন মনে করিনি। তুই আছিস তো। সব ঠিক হয়ে যাবে। এই ভাবতাম। কিন্তু সাহসের কারণে কখনো নিজে থেকে তোকে সব খুলে বলা হয় নি। আমি তোকে হারাতে চাই না মিমিয়া।”
“এর জন্যই তুই যদি তোর জীবনে আর কোনো ঝামেলা না চাস তাহলে সব বল। আর তুই এখানে কিভাবে। আমি যতদূর জানি নওশির স্যার তুর্কীশ। তাহলে তুই তার চাচাতো বোন মানে তুইও তুর্কীশ। তাহলে তুই বাংলাদেশে কি করছিস?”
পেখম অনেকটা সময় তাকিয়ে থেকে বলল, “আমার ব্যাপারে তুই অনেক কিছুই জানিস না মিমি তাই না।”
“আমি ভাবতাম তোকে আমার থেকে কেউ ভালো জানেই না। কিন্তু আজকে মনে হলো আমি তোর একাংশও ঠিক মতো জানি না পেখম। আমায় আর অন্ধকারে রাখিস না। আমি চাই তুই ভালো থাক। খুশি থাক। যা তুই ডিজার্ভ করিস!”
চলবে…
- প্রানেশা আহসান শীতল


![নবোঢ়া: আগুনফুলের আত্মনিবেদন [পর্ব ৬২]](https://amarlekha.com/wp-content/uploads/2025/05/IMG_20250529_231033.jpg)
![মেঘের দেশে প্রেমের বাড়ি [শেষ পর্ব]](https://amarlekha.com/wp-content/uploads/2025/10/3cf51236-2d29-45c2-a963-4d58a217fde2.jpg)
![অটবী সুখ [পর্ব-০১]](https://amarlekha.com/wp-content/uploads/2025/11/aa823019-ffef-4aa7-9651-89294bd4fbe2.jpg)
![প্রজাপতি আমরা দুজন [পর্ব-০৮]](https://amarlekha.com/wp-content/uploads/2025/07/photo_6212761625384044921_y.jpg)