সেদিন ও তুমি [পর্ব-০১]

সেদিন ও সে” দ্বিতীয় পরিচ্ছদ

সম্পর্কে নওশির পেখমের চাচাতো ভাই। তার সাথে পেখমের শেষ দেখা হয়েছিলো সাজেকে।এরপর ঠিক দুইবছর পর তাকে নিজের অধ্যায়নরত মেডিক্যালে এসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হিসেবে দেখে ভরকায় পেখম। নিজের ভরকানো কমাবার আগেই ভার্সিটির মেয়েদের উত্তেজনা দেখে পেখম অবাক সাথে জানতে পারে নওশির এখানে দুইবছর আগে ছ’মাসের জন্য ইনভাইটেড প্রফেসর ছিলো। ঢোক গিলল পেখম। সাথে সাথে মনে পরল নওশির সাজেকে থাকাকালীন পেখমকে বলেছিলো সে কোনো এক মেডিকেলে ছমাসের জন্য এসেছিলো। কিন্তু মেডিকেলের নাম বলেনি।
ক্লাস ব্রেকের পরই পেখমদের সাথে নওশিরের ক্লাস। সাজেকে পেখম উল্টাপাল্টা ব্যাবহার করেছে এখন হুট করে নওশিরের সামনে যেতেও ভীষণ ওকোয়ার্ড অনুভব হবে ভাবতেই ব্যাগ নিয়ে যেই উঠলো মিমিয়া অবাক গলায় পেখমের শার্টের এক কোনা টেনে ধরে জিজ্ঞেস করল,
“কি হল? কোথায় যাচ্ছিস! এখন তো নতুন প্রফেসরের ক্লাস। জানিস উনি যে হ্যান্ডসাম সাথে নাকি বিদেশি…
পেখম এলোমেলো চোখে এদিকসেদিক তাকিয়ে নজর লুকাতে চাইলো সাথে মনে হচ্ছে পালানোর জন্য কোনো পথ খুঁজছে। যাতে সে এখান থেকে ছাড়া পেলেই একছুটে পালাতে পারে। মিমিয়া নিজের মতো বিরবির করে কথা বলছিলো। আর পেখম এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখছে এর মধ্যে ক্লাসে প্রবেশ করল নওশির। সাথে সাথে সবাই সম্মান প্রদর্শন করে দাঁড়ালো। তবে পেখম আর সময় ব্যয় না করেই দৌড়ে পিছনের গেট থেকে বেড়িয়ে গেলো। এতে ক্লাসোর সবাই একটু ভরকায়। তবে নওশিরের মুখে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা গেলো না। সে সাধারণ ভাবে নিজের পরিচয় দিয়ে ক্লাস করতে শুরু করল। পেখম ক্লাস থেকে বেড়িয়ে জানলার সামনে লুকিয়ে বেশ কয়েকবার নওশিরকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখলো। তারপর লম্বা শ্বাস ফেলে যেই ভাবলো চলে যাবে ওমনি ভিসিকে দেখে ভরকে গেলো। লোকটা মাঝে মাঝে ক্লাসের আশেপাশে ঘুরোঘুরি করে পেখম জানতো কিন্তু আজকে ক্লাস থেকে বেড়েলো আর আজকেই কিনা ধরা পড়ে গেলো। ভিসি দীপঙ্কর রয় একবার পেখমকে দেখে ভাবলেন তারপর চোখ ছোট করে জিজ্ঞেস করল,
“আপনি এই ক্লাসের না?”
পেখম জোরপূর্বক হাসলো। যেন বাঁচতে চাইছে এই ঝামেলা থেকে। লোকটার সন্দেহ আরো গাঢ় হলো তাই পেখমের উদ্দেশ্য শান্ত গলায় বলল,
“ফলো মি!”
দ্বীপঙ্কর রয় সরাসরি প্রথম দরজা দিয়ে পেখমদের ক্লাসে ঢুকলো। পেখমও মাথা নিচু করে তার পিছনে নিজের ক্লাসে প্রবেশ করলো। ভিসিকে দেখে ক্লাসের সবাই দাঁড়ালো। নওশিরও স্যারের দিকে তাকালো সাথে পিছনে মাথা নিচু করে বিব্রত ভঙ্গিতে দাঁড়ানো পেখমকে দেখে বুঝতে সময় লাগেনি। তবুও তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া মুখে ফুটলো না। দীপঙ্কর রয় ক্লাসের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে নওশিরকে জিজ্ঞেস করল,
“ক্লাস কেমন যাচ্ছে? সবাই এক্টিভ তো?”
নওশির সৌজন্যেমূলক হাসল আর বলল,
“জ্বি।”
পেখম লজ্জায় মাথা তুলে তাকাতে পারছে না। হাতের নখ খুঁটছে আর ঠোঁট কামড়ে নিজের অস্বস্তি ঠেকানোর চেষ্টা করছে তবে সফল হবার আগেই দ্বীপঙ্কর রয় সরে গিয়ে পেখমকে দেখিয়ে বলল,
“ও আপনার ক্লাসের তা কি জানেন?”
না’ বোধক মাথা নাড়ালো নওশির। এবার যা ঘটবে তাতে লজ্জায় আর সামনে দাঁড়ানো সাহস পেখমের হবে না তা সে জানে। ভিসি আলতো হাসলো তারপর বলল,
“ব্রাইট স্টুডেন্ট বলতে পারেন কিন্তু ও আপনার ক্লাস না করে বাহিরে থেকে জানলা দিয়ে দেখছিলো। আমি অনেকটা সময় দেখে তাকে ধরে নিয়ে এসেছি। এখন বলুন তার শাস্তি আপনি দেবেন নাকি আমি কোনো ব্যবস্থা নেবো।”
কথা শেষ হতেই পেখম মুখ তুলে তাকালো। ফর্সা মুখ রক্ত জমে লাল হয়ে গেছে সাথে চোখ থেকে জল গড়াতে চাইছে তবে তা গড়ালো না রক্তাভ শিরা গুলো একদম স্পষ্ট ফুটে আছে যেন মিনতি করছে এই ভুল আর হবে না। নওশির একবার পেখমের দিকে তাকালো। নওশিরকে তাকাতে দেখেই পেখম মাথা নিচু করে ফেলল তা দেখে নওশির মাথা নিচু করে নিজের চুলে হাত ঢুবিয়ে পিছনের দিকে ঠেলে দিয়ে নিম্ন গলায় বলল,
“আমি হ্যান্ডেল করে নেবো স্যার! আর এ্যজ এ্য নিউ টিচার আজকে আমার প্রথম ক্লাস আমি চাই না স্টুডেন্টদের মাঝে আমায় নিয়ে কেনো বাজে ইমপ্রেশনস তৈরি হোক।”
দ্বীপঙ্কর রয় নওশিকের কথায় নরম হলো তাই সবার দিকে হাসলো আর তিনিও নওশিরকে নিচু গলায় বলল,
“তাহলে হ্যন্ডেল করে নিয়েন। বেস্ট ওফ লাক।”
এরপর সকল স্টুডেন্টের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,
“বিষয়টা নতুন টিচারের উপর ছেড়ে দিলাম। আশা করি উনি আপনাদের হতাশ করবে না। নওশির স্যার বেস্ট ওফ লাক।”
কথাটা বলেই হেসে তিনি চলে গেলেন। পেখম এখনে মাথা নিচু করে দাড়িয়ে আছে দেখে নওশির ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করল,
“আপনি কি এখনো দাড়িয়ে থাকবেন নাকি নিজের সীটে যাবেন?”
থতমত চোখে তাকায় পেখম তারপর দ্রুত গলায় বলল,
“নিজের,, নিজের সীটে যাবো।”
“গুড।”
পেখম ঢোক গিলে যেয়ে নিজের ডেস্কে বসতেই নওশির পেখমের উদ্দেশ্য বলল,
“আপনি কেনো এমন করেছেন তার রিজন আমি আস্ক করবো না। তবে আপনাকে শাস্তি না দিলে স্টুডেন্টরা এই কাজ করতেই থাকবে তাই আপনার শাস্তি হলো পেইজ ৮০ থেকে ১২০ পর্যন্ত যা আছে আর যেভাবে আছে ঠিক সেভাবেই ২০বার লিখবেন। এবং নেক্সট যেদিন আমার ক্লাস সেদিন আমার কেবিনে দিয়ে আসবেন। গট ইট?”
মাথা নাড়ালো পেখম। মিমিয়া এখনো বোকার মতো তাকিয়ে আছে। অদ্ভুত তারা কি এখনো স্কুলের স্টুডেন্ট নাকি যে এমন শাস্তি দিচ্ছে? ক্লাসের সবাই সতর্ক হলো এই ভেবে যে, দেখতে হ্যান্ডসাম হলেও এই লোক বড়ই ডেয়ারিং!
নওশির সবার মুখের পরিস্থিতি বুঝে বই বন্ধ করে বলল,
“আজকের ক্লাস এই পর্যন্তই! আপনাদের কোনো প্রশ্ন থাকলে করতে পারেন!”
এরপরের সময় টুকু প্রশ্ন-উত্তর আদানপ্রদানেই চলে গেছে। নওশির বিদেশি বিধায় সবার মাঝে কিউরোসিটির অভাব নেই আর নওশিরও এখান বাংলা ভাষা ভালোমতো আয়ত্তে এনে কোনো বিরক্তি ছাড়াই সকল প্রশ্নের জবাব দিয়েছে। তবে তার ভেতর নিজের পার্সোনাল জীবন নিয়ে কোনো প্রশ্নের জবাব সে করে নি। তাই পেখম একটু অবাক হয়েছে। সকল প্রশ্নের জবাব হাসি মুখে দিতে পারলে এই প্রশ্ন গুলো কেনো এড়িয়ে গেলো? এর মধ্যে ক্লাস শেষের বেল বাজতেই নওশির ফাইল আর ল্যাপটপ ঘুছিয়ে নিয়ে বলল,
“নেক্সট ক্লাসে দেখা হচ্ছে। ততদিন পর্যন্ত স্টে সেফ!”
কথাটুকু বলেই সে চলে গেলো। নওশির চলে যেতেই স্বস্তির শ্বাস ফেলল পেখম। এদিকে মিমিয়া আবারো বিরবির করছে সাথে পেখমকে ঠেলছে। বিরক্তির সাথে প্রশ্ন শুধায় পেখম,
“সমস্যা কি তোর?”
“দেখলি, লোকটা কেমন? তোকে এতো গুলো কাজ দিয়েছে তুই একা এতো গুলো কাজ করবি কিভাবে বল তো। শ্লা বদমাশ!” পেখম বোকার মতো তাকিয়ে আছে সে কি বলবে যেন কথা খুঁজে পাচ্ছে না। খানিক সময় এমন বোকার মতো তাকিয়ে থেকে বলল, “আমার আজকে একটুও ক্লাস করতে ইচ্ছে করছে না। আমি বাসায় গেলাম। তুই থাক।” “চলে যাবি?” “হু! মাথা ধরেছে।” “আচ্ছা যা। পৌঁছে টেক্সট করিস।” “হুম!” কথাটা বলেই ব্যাগ নিয়ে পেখম বেড়িয়ে যায়। আজকে কার মুখ দেখে ঘুম থেকে উঠেছে কে জানে। কিন্তু কথা হলো নওশির এভাবে শান্ত মেজাজ নিয়ে শাস্তি কেনো দিচ্ছে! এটা নতুন নয়। নিজের চৌদ্দটা বছর পেখম তুর্কীতে কাটিয়েছে তার দরুণ নওশিরকে ভালোই চেনে পেখম। আর নওশিরের মেজাজ রাগ করলে এমন বরফের মতো শান্ত হয়ে থাকে যাতে নিজের রাগ এখানে প্রকাশ না পায়। আর এই কারণেই বোধহয় অহেতুক প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিলো অথচ এই লোকের পেটে বোম ফেললেও একটা কথা ঠিক মতো বের করানো যায় না আর সে এখানে হেসে হেসে কথা বলছে।
“অদ্ভুত!”
মুখ থেকে এই শব্দটা বের হতেই পায়ের সাথে পা লেগে ধপ করে পড়ে যায় পেখম। মুখের সামনে কালো প্যানৃট পরিহিত ও কালো চকচকে শু দেখে পেখম মুখ তুলে উপরের দিকে তাকায়। নওশির নির্বিকার চিত্তে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে। তার হাতে এপ্রোন ঝুলিয়ে কফির কাপ ধরে আছে। অথচ সামনে যে এভাবে পেখম পড়ে গেছে তাতে সে একটুও ভরকায়নি। উল্টো এখনো শান্ত চোখে তাকিয়ে আছে। এর মধ্যে লেকচারার আফ্রিদ এসে পেখমকে এভাবে পড়ে থাকতে দেখে ভরকায় আর এগিয়ে এসে চিন্তিত ভাবে পেখমের সামনে বসে জিজ্ঞেস করল,
“পড়লে কি করে পেখম। উঠে বসো।”
পেখম এতোটা অস্বস্তিতে কখনোই পড়েনি। সে উঠে বসে আশে পাশে তাকায়। সবাই এখন শুধু নওশির, পেখম আর আফ্রিদের দিকে তাকিয়ে আছে। আফ্রিদ নওশিরের থেকে কম হলেও দুই থেকে তিন বছরের ছোট। আফ্রিদ আরো একবার নওশিরের দিকে তাকায়। নওশির পেখমকে উঠে বসতে দেখে শুধু শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,
“আর ইউ ওকে?”
মাথা নাড়িয়ে সায় জানায় পেখম। উত্তর পেতেই লম্বা কদম ফেলে নওশির চলে যায়। আর নওশির চলে যেতেই দ্রুততার সাথে নিজের জিনিসপত্র ব্যাগে পুরে লজ্জিত গলায় বলল,
“দুঃখিত স্যার। পা পিছলে পড়ে গেছিলাম। আমি ঠিক আছি। ধন্যবাদ।”
এক শ্বাসে এতোগুলো কথা বলেই নিজেও যেন ছুটে পালিয়ে গেলো। পেখম চলে যেতেই আফ্রিদ আশেপাশে তাকায়। সবাই এতোটা সময় তার দিকে তাকিয়ে ছিলো। কিন্তু পেখমের এমন দৌড়ঝাঁপ করা একদমই উচিত নয়। পেখমের অসুস্থতা আর সে অভিশপ্ত দুর্ঘটনা হসপিটালের মাঝে মোটামুটি সবাই জানে বলা যায়। পেখমের জীবনে যখন সেই দুর্ঘটনা ঘটে তখন আফ্রিদ হসপিটালে ইন্টার্নি ডক্টর। হসপিটালের তখন একমাত্র সিরিয়াস প্রেসেন্ট পেখমই ছিলো তাই চিকিৎসকরা তাকে ভালো মতোই চেনে সাথে এখানকার স্টুডেন্টও বটে! তার সেই ট্রমা থেকে কামব্যাক করার জার্নিটাও অসাধারণ ছিলো তাই বোধহয় আফ্রিদের এই মেয়েটাকে এতো পছন্দ। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হলো নওশির স্যার মেয়েটার সাথে এমন করলো কেনো? আফ্রিদ স্পষ্ট দেখেছে পেখম পড়ে যাবার পরও নওশিরের মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি। নতুন প্রফেসরটা অদ্ভুত শুনেছিলো কিন্তু এতোটা, তা ভেবেও কেমন শরীরে কাটা দিচ্ছে আফ্রিদের!
চলবে,…

  • প্রানেশা আহসান শীতল
  • Related Posts

    নবোঢ়া: আগুনফুলের আত্মনিবেদন [পর্ব ৬২]

    একটা ছোট মেয়ে। বয়স নয় কি দশ হবে। মাথাভর্তি উসকোখুসকো চুল। পরনের জামাকাপড়ে ময়লার পুরু আস্তরণ জমে আছে। কাঁধে ঝুলছে একটা মোটা পাটের বস্তা, যার প্রায় অর্ধেকটা ভরে গেছে হলদেটে…

    নবোঢ়া: আগুনফুলের আত্মনিবেদন [পর্ব-৬১]

    গুলনূরের চোখের কোণ বেয়ে নেমে আসা জলকণা গালের ওপর দিয়ে গড়িয়ে পড়ে একবিন্দু একবিন্দু করে। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, কষ্টের মাঝেও সে হাসছে! তার ঠোঁটের কোণ বিদ্রূপে ভরা। জাওয়াদের দিকে নির্ভীক…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    নবোঢ়া: আগুনফুলের আত্মনিবেদন [পর্ব ৬২]

    নবোঢ়া: আগুনফুলের আত্মনিবেদন [পর্ব ৬২]

    নবোঢ়া: আগুনফুলের আত্মনিবেদন [পর্ব-৬১]

    নবোঢ়া: আগুনফুলের আত্মনিবেদন [পর্ব-৬১]

    মেঘের দেশে প্রেমের বাড়ি [শেষ পর্ব]

    মেঘের দেশে প্রেমের বাড়ি [শেষ পর্ব]

    অটবী সুখ [পর্ব-০১]

    অটবী সুখ [পর্ব-০১]

    প্রজাপতি আমরা দুজন [পর্ব-০৮]

    প্রজাপতি আমরা দুজন [পর্ব-০৮]

    মেঘের দেশে প্রেমের বাড়ি [পর্ব-০৯]

    মেঘের দেশে প্রেমের বাড়ি [পর্ব-০৯]