একটা ছোট মেয়ে। বয়স নয় কি দশ হবে। মাথাভর্তি উসকোখুসকো চুল। পরনের জামাকাপড়ে ময়লার পুরু আস্তরণ জমে আছে। কাঁধে ঝুলছে একটা মোটা পাটের বস্তা, যার প্রায় অর্ধেকটা ভরে গেছে হলদেটে শুকনো পাতায়। স্পষ্টতই মেয়েটি পাতা কুড়াতে কুড়াতে এদিকে চলে এসেছে। পাহাড়টিতে গাছের সংখ্যা অগণিত। শুকনো পাতার ছড়াছড়ি সর্বত্র। হাতে একটা সরু লাঠি। মাত্র কয়েক পা দূরত্বে দূরে দাঁড়িয়ে আছে। তার দৃষ্টি নিবদ্ধ জাওয়াদের মুখের ওপর। বড় বড় চোখ দুটি উপচে পড়ছে কৌতূহলে। সামান্য ভয়ও লুকিয়ে আছে সেখানে।
জাওয়াদও স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মেয়েটির দিকে। কিছুক্ষণ এভাবেই দুজন দুজনকে পর্যবেক্ষণ করে। হঠাৎ মেয়েটি দুই পা পিছিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে, ‘আপনি… আপনি কানতেছিলেন?
জাওয়াদ অস্বীকারসূচক মাথা নাড়ায়। না, সে কাঁদছিল না। কিন্তু মেয়েটি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে প্রকৃত সত্য। লোকটার চোখমুখ রক্তিম আভায় রাঙা, চোখের পাতাগুলো ফুলে উঠেছে। মেয়েটি আগ্রহী চোখে তাকিয়ে থাকে। সে কখনো এতবড় পুরুষ মানুষকে কাঁদতে দেখেনি। তার নানাভাই কখনো কাঁদে না। মামারা কাঁদে না। গ্রামের অন্য কোনো পুরুষকে কাঁদতে দেখেনি। শুধুমাত্র মামিদের কান্না করতে দেখেছে। বোনদের কাঁদতে দেখেছে। তাহলে এই লোকটা কেন কাঁদছে?
জাওয়াদ কঠোর গলায় জিজ্ঞেস করে, ‘কী দেখছো?’
‘আমিযে হুনলাম আপনি কানতেছেন। মিছা কথা কওন ভালা না।’
‘কান্নার শব্দ শুনে এদিকে এসেছো?’
মেয়েটি সম্মতিসূচক মাথা নাড়ায়। তারপর সরল কণ্ঠে বলে, ‘আপনি তো জোয়ান মানুষ। তয় কান্দেন কেন?’
‘জোয়ান মানুষের কি কান্না করার অধিকার নেই?’
মেয়েটি মাথা চুলকায়, গভীরভাবে চিন্তা করে। তারপর সরলতার সাথে উত্তর দেয়, ‘আছে। তয় আমি দেহি নাই কোনোদিন। আমার নানা কয়, পুরুষ মানুষ কান্দে না। মাইয়া মানুষ কান্দে।’
জাওয়াদ মুখ ফিরিয়ে নেয় অন্যদিকে। মেয়েটি সাহস সঞ্চয় করে এক পা এগিয়ে এসে কৌতূহলের বশে জিজ্ঞেস করে, ‘আপনের কী অইছে? কেউ মাইরা দিছে? চুরি করতে আইছিলেন? ধরা পড়ছেন?’
জাওয়াদ ফ্যাসফ্যাসে গলায় উত্তর দেয়, ‘আমি চোর নই।’
‘তাইলে?’
জাওয়াদ তিক্ত স্বরে বলে, ‘বিরক্ত করো না তো, যাও এখান থেকে।’’
প্রায় দুই মিনিট অতিবাহিত হওয়ার পর জাওয়াদ ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। মেয়েটি সত্যিই চলে যাচ্ছে! বেশ আত্মসম্মানবোধ তো! কাঁধে বস্তা ঝুলিয়ে পাতা কুড়াতে কুড়াতে ধীরে ধীরে নিচের দিকে নামছে। মাঝেমধ্যে পেছন ফিরে তাকাচ্ছে তার দিকে।
হঠাৎ দুই হাতের তালুতে তীব্র যন্ত্রণা অনুভূত হয়! এতক্ষণ মনের ব্যথা, ক্রোধের আগুন যন্ত্রণাটাকে চাপা দিয়ে রেখেছিল। সে দ্রুত হাত দুটো চোখের সামনে তুলে ধরে। পুরো হাতের তালু জুড়ে আড়াআড়িভাবে কাটা দাগ ছড়িয়ে আছে জালের মতো! কয়েক জায়গায় রক্ত জমাট বেঁধে কালচে বাদামি হয়ে শুকিয়ে গেছে। বেশ কয়েক স্থানে চামড়া উঠে গিয়ে ভেতরের গোলাপি মাংস উঁকি দিচ্ছে। মুহূর্তেই স্মৃতি ফিরে আসে — রশি দিয়ে গুলনূরকে শক্ত করে বাঁধার সময়, তাড়াহুড়োর মধ্যে হাত কেটে গিয়েছিল! রশিটি মানুষ বহনের জন্য একেবারেই উপযুক্ত নয়, বুঝতে পারেনি তখন…গুলনূর! রাগের বশে সে কী ভয়ানক কাজ করে ফেলেছে! জাওয়াদ হড়বড় করে লাফিয়ে উঠে প্রবল বেগে ছুটতে শুরু করে নিচের দিকে। পাহাড়ের খাড়া, পিচ্ছিল ঢাল বেয়ে নামতে গিয়ে পা হঠাৎ ভারসাম্য হারায়, মাটি আঁকড়ে ধরতে ব্যর্থ হয়। প্রায় মুখ থুবড়ে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়! দুই হাত ছড়িয়ে কোনোমতে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনে। কিন্তু ভাগ্য আজ সম্পূর্ণ বিমুখ। হঠাৎ একটা শক্ত গাছের শেকড়ে তার পা আটকে যায়! দেহ সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। সজোরে মাটিতে আছড়ে পড়ে, দম বেরিয়ে যায় বুক থেকে। ডান হাঁটু প্রবল আঘাত পায় একটা ধারালো পাথরের সূচালো কোণে। তৎক্ষণাৎ টাটকা লাল রক্ত ফিনকি দিয়ে বের হয়ে আসে, প্যান্টের কাপড় রক্তে ভিজে যায়।
জাওয়াদ দাঁত চেপে, চোখমুখ কুঁচকে, যন্ত্রণা গিলে ফেলে তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়ায়। খোঁড়াতে খোঁড়াতে দৌড়াতে শুরু করে।
ছোট মেয়েটি অবাক বিস্ময়ে দেখে পুরো ঘটনাটা। তার বিশাল চোখ দুটো আরও বড় হয়ে যায় আশ্চর্যে। জাওয়াদের সাদা শার্টটা পড়ে আছে পাহাড়ের উপর। সে দৌড়ে যায় ওপরের দিকে, হাঁপাতে হাঁপাতে শার্টটা তুলে নেয়। তারপর নেমে আসে রাস্তায়। ততক্ষণে জাওয়াদ প্রাণপণে দৌড়ে অনেক দূর চলে গেছে।
হুড়মুড়িয়ে জাওয়াদ সেই পরিত্যক্ত ঘরটিতে ঢোকে। প্রথমে ভীত দৃষ্টি তুলে উপরে তাকায়, ছাদের কড়িকাঠের দিকে। অর্ধেক রশি ঝুলে আছে সেখানে। সঙ্গে সঙ্গে আতঙ্কিত চোখ নিচের দিকে নেমে আসে। রশি ছিঁড়ে উঁবু হয়ে মেঝেতে পড়ে আছে গুলনূর! মেঝেতে টাটকা রক্ত! হাত দুটো পেছনে বাঁধা, পা দুটোও শক্ত করে বাঁধা। কী নির্মম, কী ভয়ংকর সেই দৃশ্য! কোনো শত্রুও যেন এমন দৃশ্য না দেখে! জাওয়াদের বুকের ভেতরটা খালি হয়ে যায় এক মুহূর্তে। ছুটে যায় গুলনূরের কাছে। হাত-পায়ের বাঁধন খুলতে শুরু করে। রশি রক্তে পিচ্ছিল, আঙুল কাঁপছে, দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে। খুলে ফেলে সব বাঁধন। তারপর সাবধানে গুলনূরের মাথাটা তুলে নিজের বাহুতে রাখে…ঠিক বুকের কাছে।
গুলনূরের নাক থেকে রক্ত ফোঁটা ফোঁটা করে এখনো ঝরছে। মুখের কোণ থেকে রক্তের সরু ধারা বেরিয়ে গলা বেয়ে নামছে। মুখের ভেতরটা ভর্তি হয়ে আছে রক্তে। কপাল ফেটে রক্ত শুকিয়ে গেছে কালচে লাল হয়ে! হাতের কব্জিগুলোতে রক্ত। চামড়া কেটে গিয়ে মাংস দেখা যাচ্ছে! রশি রক্তে ভিজে লাল হয়ে আছে। আঁটসাঁট রশির ধারালো আঁশ চামড়া ভেদ করে মাংস অবধি প্রবেশ করেছে। পায়ের গোড়ালিতেও একই অবস্থা। গুলনূর পড়ে গিয়ে নিজেকে মুক্ত করতে কতটা ছটফট করেছিল, কতটা কষ্ট পেয়েছিল…সেটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। জাওয়াদ ভয়ে, আতঙ্কে চিৎকার করে উঠে, ‘গুলনূর! গুলনূর! এই গুলনূর! একটাবার শোনো! চোখ খোলো!’
কোনো সাড়া নেই। গুলনূরের মুখ মৃত ব্যক্তির মতো ফ্যাকাশে। শ্বাস নিচ্ছে কি না বোঝা যাচ্ছে না। জাওয়াদ কাঁপা হাতে, অশ্রুসিক্ত চোখে গুলনূরের নাক ও ঠোঁটের কোণ দিয়ে বেরিয়ে আসা রক্ত মুছতে থাকে আর উন্মাদের মতো বলতে থাকে, ‘এতো বড় অপরাধবোধ নিয়ে বাঁচতে পারব না গুলনূর। আমি বুঝতে পারিনি। আমি বুঝতে পারিনি। আমি কী করলাম! কী ভয়ানক কাজ করে ফেললাম! গুলনূর! গুলনূর, তাকাও আমার দিকে! চোখ খোলো! প্লিজ…’
জাওয়াদ গুলনূরকে বুকে জড়িয়ে ধরে, দোলাতে থাকে, যেমন করে ছোট শিশুকে দোলানো হয়।
গুলনূর পিটপিট করে চোখ খুলে তাকায়। অস্পষ্ট দৃষ্টিতে জাওয়াদের মুখ খুঁজতে থাকে। যখন রশি ছিঁড়ে দপ করে পড়েছিল মেঝেতে, ভেবেছিল মরে যাবে এবার। শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল, চোখের সামনে অন্ধকার নেমে এসেছিল। কিন্তু মরেনি! রক্তাক্ত হয়ে, থেতলে যাওয়া দেহ নিয়ে বেঁচে আছে। ঠোঁট নাড়িয়ে ক্ষীণ সুরে, বিলাপের মতো বলে, ‘শত্রুর ছেলে… ভুল করেনি… শত্রুর ছেলে… ভুল করেনি…’
জাওয়াদের বুক দুমড়ে-মুচড়ে আসে যন্ত্রণায়। গুলনূর তার করা নির্মম কাজকে ন্যায় ভাবছে! সঠিক ভাবছে! কিন্তু সে তো নিজেকে গুলনূরের শত্রু ভাবে না। সে শত্রুর ছেলে হতে চায় না। কখনো চায়নি। কিন্তু তার হাত দিয়ে, ক্রোধের বশে শত্রুর ছেলের মতোই নিষ্ঠুর কাজ ঘটে গেছে। রক্তাক্ত গুলনূরকে সে সহ্য করতে পারছে না। সে কী করবে? কী করবে এখন?
গুলনূরের চেতনা ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে আসছে। অনেক রক্ত বেরিয়ে গেছে শরীর থেকে। দুর্বল দেহ আর ধরে রাখতে পারছে না প্রাণ। সে কি মরে যাবে এবার? জাওয়াদের কোলে মরবার জন্যই কি এতক্ষণ বেঁচে ছিল?
তার অস্পষ্ট উপলব্ধি হচ্ছে, জাওয়াদের উষ্ণ, লোমশ বুকে তার মুখটা চেপে ধরে রাখা হয়েছে। তার মৃত্যু অন্তত রাস্তাঘাটে নয়, ময়লার স্তূপে নয়, একা নয়… কারো বুকে, কারো কোলে হতে চলেছে। আনন্দে গুলনূরের ঠোঁটে হাসি ফুটে ওঠে। টোকাই আরশিনু’’র মৃত্যু রাস্তায় হচ্ছে না। এর থেকে সুখের কী আছে? এই মুহূর্তে তার থেকে ভাগ্যবান আর কে আছে এই পৃথিবীতে? গুলনূর ঝাপসা চোখে জাওয়াদের ঝাপসা মুখটা দেখে। হাত বাড়ায় ওপরের দিকে।
দাসী গুলনূর… ছদ্মবেশী নয়নতারা… টোকাই আরশিনু রক্তাক্ত হাতে জাওয়াদের মুখ স্পর্শ করে। কী মায়া ওই স্পর্শে! কী কোমলতা! যেন আশীর্বাদ দিচ্ছে। জাওয়াদ গুলনূরের হাত ধরে ফেলে, চুমু খেয়ে হৃদয়ের সবটুকু মায়া নিয়ে ডাকে, ‘গুলনূর।’
গুলনূরের হঠাৎ করে ভীষণ বলতে ইচ্ছে হয়, ‘তোমাকে কবুল করতে পারিনি দৈত্যকূলের রাজকুমার…তবে তোমার কোলে মৃত্যুকে কবুল… কবুল…কবুল।’
তার আগেই চেতনা ফিকে হয়ে আসে, অন্ধকার ঘনিয়ে আসে চারপাশে। হাতটা নিথর হয়ে পড়ে যায়। জাওয়াদ স্তব্ধ হয়ে যায় এক মুহূর্তের জন্য। কম্পিত হাতে গুলনূরের নাকের কাছে হাত নিয়ে যায়, শ্বাস চলছে কি না বোঝার জন্য! চলছে… কিন্তু ধীর! সুতোর মতো ক্ষীণ। যে কোনো মুহূর্তে ছিঁড়ে যাবে।
জাওয়াদ এক সেকেন্ডও নষ্ট না করে খোঁড়াতে খোঁড়াতে দৌড়ে যায় পাশের ঘরে চাবি নিতে। চাবি নিয়ে ফিরে এসে গুলনূরকে কোলে তুলে নেয়। তার আহত হাঁটু যন্ত্রণায় ভেঙে আসে, পা কাঁপতে থাকে। সে দাঁত চেপে, সর্বশক্তি দিয়ে, প্রাণপণে দৌড়ে যায় গাড়ির দিকে। গুলনূরের নিথর দেহ বুকে জড়িয়ে ধরে গাড়িতে বসে গাড়ি স্টার্ট দেয়। ইঞ্জিন গর্জন করে ওঠে। ছয় কিলোমিটার দূরে একটা বাজার আছে। সেখানে ডাক্তার পাওয়া যাবে। যদিও সেরকম ভালো, অভিজ্ঞ ডাক্তার পাওয়ার কথা নয়। কিন্তু এই মুহূর্তে প্রাথমিক চিকিৎসাটুকুই অনেক কিছু।
জাওয়াদ দ্রুত গাড়ি চালাচ্ছে, এবড়োখেবড়ো পথে গাড়ি লাফাচ্ছে, ঝাঁকুনি খাচ্ছে। মাঝেমধ্যে পাশে তাকিয়ে গুলনূরকে দেখছে, তার মুখের রঙ দেখছে। ভয়ার্ত কণ্ঠে ডাকছে, ‘গুলনূর! ধরে রাখো! শোনো আমার কথা! কিছু হবে না! সব ঠিক হয়ে যাবে! আমি তোমাকে বাঁচাব!’
গুলনূরের শরীর ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে আসছে। জাওয়াদ ভয়ে আতঙ্কে শক্ত করে নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে, রক্ত বের হয়ে আসে ঠোঁট থেকে। চোখ ফেটে অঝোরে জল বেরোচ্ছে।
জাওয়াদ আবার ডাকে। মিনতি করে বলে, ‘গুলনূর! এইতো এসে গেছি! আর একটু! ধরে থাকো!’
রাগে, দুঃখে জাওয়াদ স্টিয়ারিং হুইলে বার কয়েক ঘুসি মারে। কী হচ্ছে! কী হচ্ছে তার সাথে! কেন এমন হলো! কেন সে এতটা নিষ্ঠুর হয়েছিল!
বাজারের কেন্দ্রস্থলে পৌঁছে গাড়ি থামায় ডাক্তারখানার ঠিক সামনে। দরজায় একটা মরচে-ধরা তালা ঝুলছে। পাশের মুদির দোকান থেকে একজন লোক বলে, ‘ডাক্তার সাহেব আজ আসবে না ভাই। ছুটিতে আছেন। মেয়ের বিয়ে।’
জাওয়াদের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। সে আকুতিভরা টলটলে চোখে বলে, ‘ভাই, ভাই আশেপাশে কোনো হাসপাতাল আছে? ডাক্তার আছে কোথাও? প্লিজ, আমাকে বলেন! আমার সাথে একজন রোগী আছে, খুব জরুরি!’
মানুষজন উৎসুক হয়ে জড়ো হয়। কেউ কেউ গাড়ির দিকে উঁকি মারে, কেউ ফিসফিস করে কথা বলে। একজন বয়স্ক লোক এসে বলে, ‘এই এলাকায় তো আর হাসপাতাল নেই বাবা। তবে এখান থেকে দুই কিলোমিটার গেলে, মূল সড়কের ডান পাশে একটা হলুদ রঙের পাকা বাড়ি দেখবে। সেখানে একজন মহিলা ডাক্তার থাকেন। নাম ডাক্তার ফারহানা। শহর থেকে আসেন মাঝেমধ্যে, গরিব মানুষদের বিনা পয়সায় দেখেন। নিচতলায় তার চেম্বার আছে। আজকে বাড়িতেই আছেন তিনি, দুপুরের পর রোগী দেখা শুরু করেন। এখন সকাল বলে চেম্বার খোলেনি, তবে জরুরি হলে নিয়ে যান দ্রুত। তিনি দয়ালু মানুষ, ফিরিয়ে দেবেন না।’
জাওয়াদ আর এক সেকেন্ডও দেরি করে না। ড্রাইভিং সিটে বসে কাঁপা হাতে চাবি ঘোরায়। ইঞ্জিন গর্জে ওঠে। এক্সিলারেটরে জোরে চাপ দিতেই গাড়ি লাফিয়ে এগিয়ে যায়। মাত্র দুই কিলোমিটার। কিন্তু জাওয়াদের কাছে মনে হচ্ছে যেন দুই যুগ পেরিয়ে যাচ্ছে। রাস্তাটাও বিভীষিকাময়। খানাখন্দে ভর্তি, এবড়োখেবড়ো মাটির পথ। বর্ষার পর মাটি শক্ত হয়ে গেছে, কিন্তু জায়গায় জায়গায় খাদ রয়ে গেছে। গাড়ি ঝাঁকুনি খেতে খেতে এগিয়ে যেতে থাকে।
অবশেষে দূরে একটা বাড়ি চোখে পড়ে। দোতলা, পাকা ইটের বাড়ি। গাড়ি থামে বাড়ির সামনে। একটা পুরনো লোহার গেট। সবুজ রঙের পেইন্ট জায়গায় জায়গায় উঠে গেছে, মরচে পড়েছে। গেটের ভেতর দিয়ে দেখা যায় ছোট্ট একটা উঠান, লাল মাটি বিছানো। একপাশে নিচু ছাদের একটা আলাদা ঘর। দরজায় কাঠের একটা সাইনবোর্ড ঝুলছে, সাদা রঙে মোটা অক্ষরে লেখা – চেম্বার।
দরজা বন্ধ! জাওয়াদ গুলনূরকে কোলে তুলে নেয়। মেয়েটা একদম হালকা, পাখির মতো। জাওয়াদ দৌড়াতে শুরু করে। গেট ঠেলে ভেতরে ঢোকে, উঠান পার হয়ে মূল বাড়ির দিকে যায়। চিৎকার করে ডাকে, ‘কেউ আছেন? কেউ আছেন? প্লিজ, দরজা খুলুন!’
আবার চিৎকার করে, ‘ডাক্তার! ডাক্তার বাড়িতে আছেন?’
ছুটতে ছুটতে সে বাড়ির সিঁড়ির কাছে পৌঁছে যায়। পাকা ইটের সিঁড়ি, লাল রঙের। সে মরিয়া হয়ে আবার চিৎকার করে। দোতলা থেকে পায়ের শব্দ ভেসে আসে। তারপর একটা কণ্ঠস্বর, ‘কে? কে? কী হয়েছে?’
সিঁড়ি দিয়ে একজন মধ্যবয়সী মহিলা নেমে আসেন। তার পেছনে একজন ভদ্রলোক। মহিলা, ডাক্তার ফারহানা। চল্লিশের কোঠায় বয়স। পরনে সবুজ শাড়ি, সাদা পাড়। চুল পরিপাটি করে খোঁপায় বাঁধা, একটা সাদা ক্লিপ দিয়ে আটকানো। হাতে একটা বই ছিল, নামতে নামতে সেটা একপাশে রাখেন। ভদ্রলোকের হাতে সকালের পত্রিকা। সম্ভবত ডাক্তার ফারহানার স্বামী।
রক্তাক্ত গুলনূরের দিকে চোখ পড়তেই মুহূর্তে ডাক্তার ফারহানার চেহারা পাল্টে যায়। মুখ পানসে হয়ে আসে। তিনি দ্রুত বাকি ধাপগুলো নেমে আসেন।
‘কী হয়েছে উনার?’ বলতে বলতে তিনি গুলনূরের মুখের দিকে তাকান, তারপর জাওয়াদের দিকে।
‘ডাক্তার, প্লিজ।’ জাওয়াদের কণ্ঠ ভেঙে আসে।
ডাক্তার ফারহানা আর কোনো প্রশ্ন করেন না। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন করা শোভনীয় নয়। তিনি পেশাদারী সুরে বলেন, ‘চেম্বারে নিয়ে আসুন। তাড়াতাড়ি। এক্ষুনি।’
ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে দেখছিলেন, তিনিও তাৎক্ষণিক ভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ছুটে যান স্ত্রীর সঙ্গে। চেম্বারের বারান্দায় রাখা বেতের চেয়ারে পত্রিকাটা ছুঁড়ে ফেলেন। পকেট থেকে একগোছা চাবি বের করে চেম্বারের তালা খোলেন। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে, একে একে সব আলো জ্বালান।
‘আনুন, এদিকে আনুন।’
ডাক্তার ফারহানা দ্রুত পা চালান। তার স্বামীও তার পেছনে তৎপর হয়ে ওঠেন, যা যা লাগবে সেসব বের করতে শুরু করেন।
জাওয়াদ গুলনূরকে কোলে নিয়ে ভেতরে ঢোকে। চেম্বারের ভেতরটা ছোট্ট, কিন্তু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। কোথাও ধুলো নেই। ফিনাইলের গন্ধ বাতাসে ভাসছে। একপাশে একটা কাচের আলমারি, তার ভেতর সারি সারি ওষুধের শিশি, বোতল, ব্যান্ডেজের রোল, সিরিঞ্জের প্যাকেট সাজানো। মাঝখানে একটা লম্বা পরীক্ষার টেবিল। ওপরে তুলতুলে সাদা চাদর বিছানো। দেয়ালে সরকারি স্বাস্থ্য বিভাগের একটা পুরনো পোস্টার টাঙানো।
‘এখানে শুইয়ে দিন। খুব সাবধানে।’
জাওয়াদ সন্তর্পণে কাচের পুতুলের মতো গুলনূরকে টেবিলে শুইয়ে দেয়। তার মাথাটা আলতো করে রাখে চাদরের ওপর।
ডাক্তার ফারহানা তৎক্ষণাৎ এক কোণে যান। সেখানে একটা ছোট সিরামিকের বেসিন, একটা কল। তিনি কল খুলে হাত ভেজান, সাবান নেন, ভালো করে দুই হাত ঘষে ধুয়ে ফেলেন। তারপর একটা ড্রয়ার থেকে সাদা রাবারের গ্লাভস বের করে দুই হাতে পরেন টান টান করে।
তারপর গুলনূরের দিকে ঝুঁকে পড়েন। প্রথমে তার মুখের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস অনুভব করার চেষ্ট করেন। দুই আঙুল তুলে গুলনূরের গলার পাশে, চোয়ালের নিচে রাখেন। চোখ বন্ধ করে মনোযোগ দিয়ে নাড়ির স্পন্দন অনুভব করেন। মনে মনে সেকেন্ড গুনতে থাকেন। তারপর আলতো করে গুলনূরের চোখের পাতা তুলেন। একটা ছোট্ট পকেট টর্চ পকেট থেকে বের করে চোখের মণিতে আলো ফেলেন। মণি সংকুচিত হচ্ছে কিনা দেখেন।
প্রশ্ন করেন, ‘কী করে হলো এসব?’
জাওয়াদের গলা দিয়ে শুধু ফিসফিসিয়ে আকুতি বেরিয়ে আসে, ‘প্লিজ… ওকে বাঁচান। প্লিজ, ডাক্তার।’
ডাক্তার ফারহানা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে এক মুহূর্ত জাওয়াদের দিকে তাকান। পরক্ষণেই মনোযোগ ফেরান গুলনূরের দিকে। তার হাত দুটো চলতে থাকে দক্ষতার সঙ্গে। হাত-পায়ের ক্ষতগুলো পরীক্ষা করেন একে একে। হাতের কব্জিতে, পায়ের গোড়ালিতে রক্তজমা ক্ষত।
‘নাড়ি দুর্বল। শ্বাস-প্রশ্বাস চলছে। কপালে আঘাত পেয়েছে, তবে খুব গভীর মনে হচ্ছে না, হাড়ে বড় ক্ষতির লক্ষণ নেই। রক্তক্ষরণ বেশি হওয়ায় শরীর শক-এ চলে গেছে, সেজন্যই অজ্ঞান। এখন…’ তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন, ‘এখন আতঙ্কিত না হয়ে আমাকে কাজ করতে দিন। আপনি বাইরে যান, বারান্দায় বসুন।’
‘ডাক্তার, আমি এখানে থাকতে চাই…’
ডাক্তার ফারহানার কণ্ঠ কঠোর হয়ে ওঠে, ‘না, যান। এখুনি বাইরে যান। কাজে বাধা দেবেন না। আমার সম্পূর্ণ মনোযোগ দরকার। আপনি এখানে থাকলে সেটা বিঘ্নিত হবে। বাইরে গিয়ে অপেক্ষা করুন।’
জাওয়াদ পেছনে সরে যায়। তার পা দুটো সীসার মতো ভারী। সে ধীরে ধীরে দরজার দিকে পা বাড়ায়। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে একবার ঘুরে তাকায়। দেখে ডাক্তার ফারহানা আলমারি থেকে বোতল বের করছেন, তার স্বামী তুলো আর ব্যান্ডেজ নিয়ে আসছেন। গুলনূর টেবিলে শুয়ে আছে প্রাণহীনের মতো। জাওয়াদ বাধ্য হয়ে বেরিয়ে আসে।
চেম্বারের সামনে, উঠানের এক কোণে একটা কিশোরী মেয়ে কাঠের গুঁড়ি কাটছে। মেয়েটির হাতে একটা বিশাল দা। একটা কাঠের গুঁড়ি মাটিতে খাড়া করে রেখেছে, তার ওপর আরেকটা কাঠ রেখে পুরো শক্তি দিয়ে দা চালাচ্ছে।
ভেতর থেকে ডাক্তার ফারহানা ডাকেন, ‘রহিমা! রহিমা! তাড়াতাড়ি ভেতরে আয়! এক্ষুনি!’
রহিমা এক ঝটকায় দা’টা মাটিতে গেঁথে দেয়। দা খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, সূর্যের আলোয় ধাতব পাতটা চক চক করে জ্বলে। মেয়েটি দুই হাত মুছে, দৌড়ে চেম্বারের ভেতরে অদৃশ্য হয়ে যায়।
জাওয়াদ দেয়ালে হেলান দিয়ে মেঝেতে ধপ করে বসে পড়ে। পা দুটো সামনে ছড়িয়ে দেয়, হাঁটু ভাঁজ করে। মাথা দেয়ালের শীতল স্পর্শে ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে। বাতাসে পাখির ডাক শোনা যায়। দূরে কোথাও একটা মোরগ ডাকছে। স্বাভাবিক একটা সকাল। কিন্তু জাওয়াদের পৃথিবী এলোমেলো হয়ে গেছে।
অনেকটা সময় গড়িয়ে যায়। হঠাৎ তীব্র যন্ত্রণা টের পায় হাঁটুতে। কামড়ের মতো ব্যথা। নিজের ক্ষত-বিক্ষত হাঁটুর কথা একদম ভুলে গিয়েছিল। সে প্যান্ট কুঁচকে উপরে তুলে দেখে, হাঁটুর জখমটা ভয়ানক। বেশ গভীর। চামড়া ছিঁড়ে গিয়ে খোলা মাংস দেখা যাচ্ছে। চারপাশে রক্ত জমাট বেঁধে কালচে বাদামি হয়ে আছে। কিছু রক্ত শুকিয়ে গেছে, কিছু এখনও ভেজা। তারও চিকিৎসা প্রয়োজন। ইনফেকশন হতে পারে।
সে দেয়ালে হাতের ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বারান্দার বেতের চেয়ারের দিকে যায়। চেয়ারের ওপর ভদ্রলোকের ফেলে যাওয়া পত্রিকাটা পড়ে আছে। জাওয়াদ সেটা সরাতে হাত বাড়ায়। ঠিক তখনই তার দৃষ্টি পড়ে পত্রিকার প্রথম পাতায়। বড় বড় কালো অক্ষরে শিরোনাম:
আড়াই বছর ধরে তল্লাশির পর প্রকাশ্যে ছায়াখুনি: টোকাই আরশিনু।
শিরোনামের নিচে একটা সাদাকালো ছবি। গুলনূরের ছবি!
জাওয়াদের পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে যায়। মনে হয় পুরো পৃথিবী হেলে যাচ্ছে। মাথার ভেতর ঘূর্ণিঝড় বয়ে যায়, চিন্তাগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে ছড়িয়ে পড়ে।
এই খবর নিশ্চয়ই ডাক্তার ফারহানার স্বামী পড়েছে! পত্রিকা তো তার হাতেই ছিল। এতক্ষণে গুলনূরকে চিনে ফেলার কথা। ছবি দেখেছে। মুখ দেখেছে। যদি ভেতরে গিয়ে মিলিয়ে দেখে? যদি থানায় খবর দেয়? যদি পুলিশ আসে?
আতঙ্ক জাওয়াদকে আষ্ঠেপৃষ্ঠে গ্রাস করে ফেলে। তার বুকের ভেতর হৃদয় দ্রুততর হয়ে ওঠে। যেন কেউ হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করছে। মাথায় রক্ত উথলে ওঠে, কানে গুনগুন শব্দ বাজে। শরীর শক্ত হয়ে মুষ্টিবদ্ধ হয় হাত দুটো।
সে লাফিয়ে উঠে দাঁড়ায়। চারপাশে তাকায় অস্থির নেকড়ের মতো। চোখ খুঁজে বেড়ায় কোনো অস্ত্র, কোনো কিছু। তারপর দৃষ্টি পড়ে উঠানের কোণে। মাটিতে গেঁথে রাখা দা’টি। রোদের আলোয় ধাতব পাত ধাতব আভা ছড়াচ্ছে।
জাওয়াদ দ্রুত খুঁড়িয়ে গিয়ে এক হাতে দা’র হাতল মুঠো করে ধরে এক টানে মাটি থেকে তুলে নেয়। তারপর চেম্বারের দরজার দিকে এগিয়ে যায়। দরজা ঠেলে ভেতরে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
ভেতরের গুলনূরকে পরিষ্কার করা হয়েছে। কপালে তুলতুলে সাদা ব্যান্ডেজ পেঁচানো। হাত-পায়ের ক্ষতগুলোতেও সাদা গজ বাঁধা। কপালের ক্ষতে সেলাই করা হয়েছে।
ডাক্তার ফারহানা ও তার স্বামী একপাশে দাঁড়িয়ে নিচু স্বরে কথা বলছিল। কাজের মেয়ে রহিমা এক কোণে দাঁড়িয়ে তোয়ালে ভাঁজ করছিল।
জাওয়াদকে দা নিয়ে প্রবেশ করতে দেখে তিনজনেই শিহরিত হয়ে ওঠে। মুখ চুনের মতো সাদা হয়ে যায়। এক পা পিছিয়ে যায় সহজাত প্রবৃত্তিতে। ভদ্রলোক হাত দুটো সামনে তুলে ধরেন, রক্ষার ভঙ্গিতে। কাজের মেয়েটি কোণে সংকুচিত হয়ে দাঁড়ায়, তোয়ালে বুকের কাছে চেপে ধরে।
জাওয়াদ হাতের দা উঁচিয়ে ধরে গর্জে ওঠে, ‘যদি অন্য কাউকে ডাকেন বা পুলিশকে খবর দেন, এখানেই তিনটে লাশ ফেলে দেব! তিনটে! শুনেছেন? কোনো শব্দ না। একটা শব্দও না!’
ভদ্রলোক কাঁপা গলায় বলেন, ‘না না, আমরা কাউকে কিছু বলব না। কাউকে না। আল্লাহর কসম, কিছু বলব না। আমরা কিছু জানি না। কিছু বলব না।’
ডাক্তার ফারহানা ভয় পেলেও নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করেন। শান্ত গলায় বলেন, ‘শুনুন। আমি একজন চিকিৎসক। আমার দায়িত্ব শুধুই প্রাণ বাঁচানো, আর কিছু না। আইন আর বিচার, সেসব আমার এখতিয়ারে নেই। আমার কাছে একজন রোগী শুধুই একজন রোগী। কে সে, কী করেছে এসব ভাবা আমার কাজ নয়।’
জাওয়াদ দা আরও উঁচুতে তুলে ধরে চিৎকার করে জিজ্ঞেস করে, ‘ও ঠিক আছে?’’
ডাক্তার ফারহানা সামান্য মাথা নাড়েন, ‘হ্যাঁ, ঠিক আছে। বিপদ কেটে গেছে। আঘাত মারাত্মক ছিল না। রক্ত বেশি গিয়েছিল। এখন ঠিক আছে। শীঘ্রই জ্ঞান ফিরবে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই হয়তো।’
‘আমি ও’কে নিয়ে যেতে পারব?’
‘পারবেন। যেকোনো সময় নিয়ে যেতে পারবেন। তবে হাসপাতালে রাখলে ভালো হতো।’
ডাক্তার ফারহানা টেবিল থেকে একটা হাতে লেখা প্রেসক্রিপশন তুলে নেন। সেটা এগিয়ে দেন জাওয়াদের দিকে, ‘এই ওষুধগুলো দিনে দুবার খাওয়াবেন। সকালে একবার, রাতে একবার। খাবার পর খাওয়াবেন। এই ইনজেকশনটা খুব জরুরি। প্রথম ডোজ আজ সন্ধ্যায় দিতে হবে। পরেরটা কাল ভোরে। মাংসপেশিতে দেবেন, রক্তে নয়। আর…’ তিনি একটু থামেন, তারপর আরেকটু জোরের সাথে বলেন, ‘আর যদি জ্বর আসে, শরীর গরম হয়ে যায়, বা শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, মুহূর্তমাত্র দেরি করবেন না। দেরি করবেন না একদম। নিকটতম হাসপাতালে নিয়ে যাবেন। বুঝেছেন? নইলে ইনফেকশন হবে।’
জাওয়াদ এক হাত বাড়িয়ে প্রেসক্রিপশন নেয়। কাগজটা ভাঁজ করে প্যান্টের পকেটে গুঁজে দেয়। অন্য হাতে দা শক্ত করে আঁকড়ে ধরা, উঁচিয়ে রাখা। চোখ সতর্ক, সন্দিগ্ধ। নেকড়ের মতো চারপাশ পর্যবেক্ষণ করে। দেয়ালের কোণ, দরজা, জানালা সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছে।
তার নিজেকে ভয়ানক এলোমেলো লাগছে। ভেতরে একটা ঝড় বইছে। গতকাল রাতে গুলনূরকে খুন করতে দেখে সে প্রচণ্ড ভয় পেয়েছিল। হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল। অথচ এখন মনে হচ্ছে, এই নিরীহ মানুষগুলো যদি চিৎকার করে, যদি সাহায্য ডাকে তাহলে এদের হত্যা করতে তার বিন্দুমাত্র দ্বিধা হবে না। সে উন্মাদ হয়ে গেছে। নিজের ভেতরে এক অচেনা রাক্ষসকে আবিষ্কার করছে। যে গুলনূরের জন্য সব করতে পারে। মারতেও পারে। হয়তো মরতেও পারে!
সে ডাক্তারের দিকে দা উঁচিয়ে রাখে, হুমকি দেওয়ার ভঙ্গিতে। তারপর এক হাতে গুলনূরকে তোলার চেষ্টা করে। কিন্তু তার শরীর আর সাড়া দিচ্ছে না। পা অবশ হয়ে গেছে, হাঁটুতে অসহ্য যন্ত্রণা। হাত কাঁপছে, কাঁধে শক্তি নেই। দুই হাত ছাড়া অসম্ভব গুলনূরকে তোলা। দুই সেকেন্ডের জন্য দা’টা টেবিলে রাখতে হবে। মাত্র দুই সেকেন্ডের মধ্যে গুলনূরকে কাঁধে তুলতে হবে। সে দা’টা আলতো করে টেবিলের ওপর রাখে। গুলনূরকে তোলার জন্য দুই হাত তার কাঁধের নিচে ঢুকিয়ে দিতে যায়..ঠিক তখনই— ভদ্রলোক বিদ্যুৎগতিতে নড়ে ওঠেন। এক টানে কাজের মেয়ে রহিমার হাত মুঠোবন্দী করেন। অন্য হাত দিয়ে তার স্ত্রীর কব্জি শক্ত করে ধরেন। এক ঝটকায় দুজনকেই টেনে নিয়ে ছিটকে সরে যান দরজার বাইরে,
পরমুহূর্তেই দরজা সজোরে বন্ধ করে দেন।
জাওয়াদ আকস্মিক ঘটনায় হতভম্ব হয়ে যায়। কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকে স্থির হয়ে। যখন বুঝতে পারে কী হয়েছে, রাগে-ক্ষোভে-আতঙ্কে দরজায় প্রচণ্ড লাথি মারে। চিৎকার করে ওঠে আহত জন্তুর মতো।


![মেঘের দেশে প্রেমের বাড়ি [শেষ পর্ব]](https://amarlekha.com/wp-content/uploads/2025/10/3cf51236-2d29-45c2-a963-4d58a217fde2.jpg)
![অটবী সুখ [পর্ব-০১]](https://amarlekha.com/wp-content/uploads/2025/11/aa823019-ffef-4aa7-9651-89294bd4fbe2.jpg)
![প্রজাপতি আমরা দুজন [পর্ব-০৮]](https://amarlekha.com/wp-content/uploads/2025/07/photo_6212761625384044921_y.jpg)