আরেকটি শীতের সকালবেলা, যখন কুয়াশার স্নিগ্ধ আবরণে মোড়ানো প্রকৃতি তার নিস্তব্ধতায় মগ্ন, তখনই গাবু এসে হাজির হয়। জানায়, এক ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ ব্যবসায়ী জুলফাকে রক্ষিতা হিসেবে কিনে নেওয়ার জন্য আলোচনা করছে। বুড়োর চোখে সাদা ছানি পড়েছে, বয়সের ভারে পিঠ বেঁকে গেছে। তার নাতি-নাতনিরা পর্যন্ত বিবাহিত। অথচ এই বয়সে এসে সে এক যুবতীর জীবনের ওপর দখল বিস্তারের পরিকল্পনা করছে।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয় হলো, এই জঘন্য লেনদেনে জুলফার নিজের পরিবারের সদস্যরাই জড়িত। তার মা মান্নাত এবং ভাই রঞ্জন, যাদের কাছ থেকে সে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসা ও সুরক্ষা প্রত্যাশা করতে পারত, তারাই এখন তার জীবনের দাম নিয়ে দরদাম করছে।
সংবাদটি শুনে শব্দরের চেহারা রক্তিম হয়ে ওঠে। তার মাথার ভেতর যেন কেউ প্রচণ্ড হাতুড়ি চালাতে থাকে। সত্যিই কি এমন হৃদয়হীন মা থাকতে পারে, যে তার নিজের কন্যার সম্ভ্রম ও ভবিষ্যৎ বিক্রি করে দিতে পারে? কোনো ভাই কি এতটাই নিষ্ঠুর হতে পারে যে, নিজের বোনকে এক বৃদ্ধ পুরুষের লালসার কাছে বিকিয়ে দিতে পারে? একটা ছোট্ট ঘর আর কিছু অর্থের বিনিময়ে কী করে একজন মানুষ তার আপন রক্তের সম্পর্কের সাথে এমন নিদারুণ খেলা খেলতে পারে?
গাবু আরও জানায়, যদি জুলফা এই প্রস্তাবে রাজি না হয়, তাহলে তারা তাকে জোর করে বেঁধে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছে। এ যেন পশুর হাটে গবাদি পশু কেনাবেচার মতোই নিষ্ঠুর বাণিজ্য।
শব্দর বহু দিন ধরে জুলফার প্রেমে ডুবে আছে। কল্পনার জগতে সে জুলফাকে তার হৃদয়ের গভীরে লালন করে পুষে রেখেছে। তার হৃদয় যতই জুলফার কাছে পৌঁছানোর জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠুক না কেন, তার মস্তিষ্ক বারবার তাকে সতর্ক করে দিয়েছে সামাজিক বিধিনিষেধের কথা। সে নিজেই নিজের ভেতরে এক অদৃশ্য কারাগার তৈরি করে রেখেছে, যেখানে তার প্রেম বন্দী হয়ে কাতরাচ্ছে প্রতিনিয়ত।
কিন্তু আজকের এই সংবাদ তার সহ্যের সীমা অতিক্রম করে যায়। তার হৃদয়ের রানি অন্য কোনো পুরুষের রক্ষিতা হয়ে যাবে, কথাটি শুনে তার সমগ্র অস্তিত্ব যেন টুকরো টুকরো হয়ে যায়। প্রেমের অসহায়ত্ব আর সামাজিক বিধিনিষেধের মাঝে পিষ্ট হয়ে সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়ে। পুরো একটা দিন সে আহত পাখির মতো নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকে। দীর্ঘ মানসিক যন্ত্রণা ও অন্তর্দ্বন্দ্বের পর অবশেষে শব্দর একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। সে গাবুকে ডেকে বলে, ‘গাবু, এক্ষুনি জুলফার মা-ভাইকে ডেকে নিয়ে আয়। তাদের সাথে জরুরি কথা আছে।’
কান্তারপুরের ছোট জমিদারের ডাক শুনে মান্নাত ও রঞ্জন ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে হাজির হয়। তাদের মুখে ভয়ের ছাপ। কী কারণে জমিদার বাবু তাদের ডেকেছেন, তা নিয়ে অস্থির হয়ে আছে।
শব্দর তাদের সামনে বসে অত্যন্ত গম্ভীরতার সাথে তার প্রস্তাব উত্থাপন করে, ‘আমি জুলফাকে বিয়ে করতে চাই।’
মান্নাত ও রঞ্জনের চোখ বিস্ফোরিত হয়ে যায়। তারা কখনো কল্পনাও করেনি, এমন একটি প্রস্তাব তাদের কানে আসতে পারে। শব্দর আরও বলে, ‘বিনিময়ে তোমরা পাবে অচিনপুরের এক বিঘা জমি এবং সেখানে একটি পাকা ঘর। রঞ্জনের জন্য আমি একটি লাভজনক ব্যবসার ব্যবস্থাও করে দেব, যাতে সে স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু আমার একটি শর্ত আছে। জুলফার সাথে তোমাদের চিরজীবনের জন্য সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে। তোমরা কখনো তাকে দেখতে আসতে পারবে না। জুলফাকে চিরতরে ভুলে যেতে হবে।’
শব্দরের প্রস্তাব শুনে প্রথমে তাদের বিশ্বাস হয় না। ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকে। তখন গ্রামীণ সমাজে জাতিভেদ ছিল খুবই কঠোর। সমাজের সর্বনিম্ন স্তরে অবস্থান করা বেদে সম্প্রদায়ের মানুষেরা কখনো কল্পনাও করতে পারে না, কোনো উচ্চবংশীয় পরিবার তাদের সাথে আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হতে চাইবে। মান্নাত আর রঞ্জনের কাছে প্রস্তাবটা আকাশ থেকে পড়া বজ্রের মতো চমকপ্রদ মনে হয়।
রঞ্জনের চোখেমুখে প্রথমে বিস্ময়, তারপর ধীরে ধীরে লোভ ঝলসে উঠতে থাকে। তার মন দ্রুত হিসাব কষে। এক বিঘা জমি মানে তাদের জীবনে স্থায়ী নিরাপত্তা। আর ব্যবসার ব্যবস্থা মানে আর নৌকায় করে এই গ্রাম থেকে ওই গ্রাম ঘুরে সাপ খেলা দেখিয়ে, ঝাড়ফুঁক করে পেট চালাতে হবে না। তার কণ্ঠস্বর কাঁপতে কাঁপতে সে অবিশ্বাসের সুরে জানতে চায়, ‘হুজুর, আপনি যা কইলেন সত্যি?’
শব্দর মাথা নাড়ায় নিশ্চিতভাবে। রঞ্জনের মুখে কৃতজ্ঞতার হাসি খেলে যায়। কিন্তু মান্নাতের চোখেমুখে বিভ্রান্তি দেখা দেয়। চিরতরে সম্পর্ক ছিন্ন করার কথাটা তার বুকে বাজতে থাকে। তার কুঁচকে যাওয়া মুখে দ্বিধা-দ্বন্দ্বের রেখা। বৃদ্ধ ব্যবসায়ী অন্তত দেখা করার এবং সম্পর্ক রাখার সুযোগ দিয়েছিল! কিন্তু রঞ্জনের জেদ আর প্রলোভনের সামনে পেরে উঠেন না। রঞ্জন মায়ের দ্বিধা দেখে তর্জন-গর্জন শুরু করে, ‘তুই কি পাগলরে মা? এমন সুযোগ আর আইবে? আমাদের মতো বেদের মাইয়ারে খানদানে জমিদার বিয়া করতে চাইছে! আর তুই ভাবতেছিস? জুলফার ভাগ্য খুইলা গেছেরে মা!’
মান্নাত ছেলের চাপ, অর্থের প্রয়োজন, আর সামাজিক প্রতিপত্তির লোভ সব মিলিয়ে নিজের বিবেকের কাছে হেরে যান। চোখে অশ্রু টলমল করতে থাকে। দারিদ্র্যের কাছে হার মেনে নেয় মাতৃত্বও। হয়তো তার মনের গভীরে কোথাও লোভও ছিল। নয়তো কি একজন মা তার আদরের মেয়েকে চিরতরে হারিয়ে দিতে রাজি হতে পারে?
ধীরে ধীরে তার মাথা নাড়ে রাজি হওয়ার ইঙ্গিতে।
শব্দর জানায়, বিয়ের আয়োজন হবে একদম চুপিচুপি, গাবুর বাড়িতে। গাবুর বাড়িতে শুধু তার বৃদ্ধ মা থাকে, যিনি কারও সাথে বেশি কথা বলেন না। দুইদিন পর, শুক্রবার সকালে তারা যেন জুলফাকে নিয়ে সেখানে চলে যায়। শব্দর তার স্বাক্ষী ও কাজী নিয়ে উপস্থিত হবে। বিয়ে সেরে জুলফাকে তার নিজের বাড়িতে নিয়ে যাবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্তটি শুনে মান্নাত আর রঞ্জনের গলা ভয়ে শুকিয়ে যায়। শব্দর কঠিন গলায় বলে, ‘কখনো কাউকে বলা যাবে না, তোমাদের মেয়ে জুলফা কান্তারপুরের জমিদার গিন্নি। এই কথা যদি কোথাও প্রচার হয়, তাহলে তোমাদের ভয়াবহ পরিণতি হবে।’
সমস্ত শর্তেই রঞ্জন ও মান্নাত রাজি হয়ে যায়। তাদের আর কোনো বিকল্প নেই। শব্দর এক থলি ভর্তি টাকা বের করে তাদের হাতে দিয়ে বিকারহীন গলায় বলে, ‘এই টাকা দিয়ে বিয়ের যাবতীয় ব্যবস্থা করো। কাপড়চোপড়, গহনাগাটি, খাওয়াদাওয়া সবকিছু।’
দুইদিন পর বিয়ে, শুনে জুলফা আঁতকে ওঠে। তার মনজুড়ে তখন রাজত্ব করছে নাভেদ। মাত্র কয়েকদিন আগেই তো তানপুরা বাজার থেকে ফিরেছে তারা। সেখানেই নাভেদের সাথে তার দ্বিতীয় সাক্ষাৎ হয়েছিল। যদিও জুলফা জানে নাভেদকে পাওয়ার স্বপ্ন অবাস্তব, তবুও হৃদয়ে একটা গোপন আশা বাসা বেঁধে আছে। এমন সময়ে এই আকস্মিক বিয়ের প্রস্তাব তাকে হতবাক করে দেয়।
জুলফা স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে সে এই বিয়ে করবে না। কিন্তু মান্নাত আর রঞ্জন তাকে বিভিন্নভাবে বোঝানোর চেষ্টা করে। এই বিয়ের বিনিময়ে তারা অনেক কিছু পাবে। জুলফা যে স্বপ্ন দেখেছে তার পরিবারকে নিয়ে, তার চেয়েও হাজারগুণ বেশি কিছু তারা পেতে পারে। নিজের পরিবারের জন্য এতটুকুও করতে পারবে না সে। বিয়ে তো একদিন করতেই হবে!
জুলফা থমকে যায়। পারিবারিক দায়বদ্ধতার ভারী শৃঙ্খল তার হৃদয়কে বেঁধে ফেলে। তার মন সম্মতি দিতে চায় না, কিন্তু পরিবারের প্রতি ভালোবাসা ও কর্তব্যের তীব্র চাপে সে দ্বিধায় পড়ে যায়। মনের ভেতর দুর্বিষহ সংঘর্ষ চলতে থাকে। অভিমানে, ক্ষোভে হতাশায় জর্জরিত হয়ে জুলফা চলে যায় গাছতলায়।
গাছতলায় বসে নিজের ভাগ্যের কথা ভাবছে জুলফা, এমন সময় তার ছোট বোন জুঁই এসে হাজির হয়। জানায়, জুলফার বর অনেক বুড়ো, খুকখুক করে কাশে, পিঠ বেঁকে গেছে, সব দাড়িও পেকে গেছে। একদিন আগেই জুঁই দেখেছে এক বুড়ো ব্যবসায়ীর সাথে তাদের মা কথা বলছে। তাদের আলোচনা ছিল জুলফাকে নিয়ে যাওয়া নিয়ে। জুঁইয়ের ধারণা সেই বুড়ো মানুষটাই হয়তো তার বোনের বর হতে চলেছে।
জুঁইয়ের বর্ণনা শুনে জুলফার বুক ফেটে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়। তার সামনে ভেসে ওঠে একটা কুৎসিত চিত্র, একজন বৃদ্ধ পুরুষ, যার দাড়িতে সাদা চুলের আধিক্য, যার কাশির কর্কশ শব্দে বাতাস কেঁপে ওঠে। তার সঙ্গে এক বিছানায় ঘুমাচ্ছে সে! ভেবেই তার সমস্ত অস্তিত্ব কেঁপে ওঠে।
নৌকায় ফিরে জুলফা আরও কঠোরভাবে জানিয়ে দেয়, এই বিয়ে সে কিছুতেই করবে না। তার কণ্ঠ এখন পূর্বের চেয়েও বেশি উঁচু ও বেপরোয়া। জমিদার গিন্নি হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই তার। এই কথা বলে সে তীব্র চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে। নৌকা কেঁপে ওঠে তার প্রতিবাদী চিৎকারে।
জুলফা তীব্র বিরোধিতা দেখে রঞ্জন মান্নাতের উপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করে। আর্থিক সুবিধার কথা তুলে ধরে সে মান্নাতকে কোণঠাসা করে ফেলে। অসহনীয় চাপের মুখে মান্নাত শেষ অস্ত্র হিসেবে আত্মহত্যার হুমকি দেয়। জুলফা বিয়েতে রাজি না হলে গলায় কলসি বেঁধে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়বে৷
পাশ থেকে রঞ্জন বলে, ‘আমি পা বেঁধে দেব।’
শুনে জুলফা সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ হয়ে যায়। তার সমস্ত প্রতিবাদ, সমস্ত বিদ্রোহ একলহমায় স্তব্ধ হয়ে পড়ে। মায়ের জীবনের ভয়ে প্রতিবাদের স্বর চুপসে যায়। সে আর কোনো কথা বলতে পারে না। শুধু নীরবে বসে থেকে অবিরাম কাঁদতে থাকে।
সেই সময় শব্দর কালীগঞ্জের আড়তেই ছিল। রাত একটু বাড়তেই সবার অগোচরে জুলফা মুখে পর্দা তুলে বাজারের দিকে রওনা দেয়। চাঁদের আলোয় তার ছায়া লম্বা হয়ে পড়ে পথে।
বাজারে পৌঁছে চারিদিকে তাকায়। দিনের কোলাহল এখন শেষ হয়ে গেছে। সমস্ত দোকানপাটের শাটার নামানো। শুধুমাত্র কয়েকটা হারিকেন এখানে-ওখানে জ্বলছে টিমটিম করে। একজন দেরিতে ফেরা দোকানদারকে দেখতে পেয়ে সে এগিয়ে যায়। বলে, ‘কান্তারপুরের জমিদারের আড়ত কোনটি?’
লোকটি কৌতূহল নিয়ে তাকায়৷ হাত বাড়িয়ে বাজারের শেষপ্রান্তের দিকে দেখিয়ে বলে, ‘ওইদিকে।’
জুলফা সেই দিকে হাঁটতে শুরু করে। দূরের ঝোপঝাড় থেকে ঝিঁঝিঁপোকাদের একটানা ডাক ভেসে আসছে। একঘেয়ে কিন্তু শান্তিদায়ক। মাঝে মাঝে পাতার খসখস শব্দ শোনা যায় যখন হাওয়া দিয়ে যায়।
আড়তের কাছাকাছি এসে দেখে, গাবু ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে। কাঁধে একটা বোঝা। জুলফা তার কাছে এগিয়ে গিয়ে শুকনো গলায় জিজ্ঞেস করে, ‘ছোট জমিদার আছেন?’
তার গলার স্বর এতটাই কর্কশ যে মনে হয় কয়েকদিন ধরে সে কথা বলেনি। গাবু তার দিকে তাকায়, কিছু বলতে যায়। তার আগেই আড়তের কাঠের দরজা ঠেলে শব্দর বেরিয়ে আসে। দরজার কব্জাগুলো চিঁচিঁ শব্দ করে।
‘কী চান?’
জুলফার চোখ দুটো সেই পুরুষের দিকে ঘুরে যায়। প্রথম দর্শনেই সে বজ্রাহত হয়। তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি জুঁইয়ের বর্ণনার সম্পূর্ণ উল্টো। কোথায় সেই বাঁকা পিঠ? তার সামনে দাঁড়ানো পুরুষটির মেরুদণ্ড একদম সোজা, ঠিক তরবারির মতো। তার মাথা গর্বের সাথে উঁচিয়ে রাখা। শরীরটা সুগঠিত। প্রশস্ত কাঁধ, বলিষ্ঠ বাহু। পরনের সাদা পাঞ্জাবি বুকের উপর টান টান হয়ে আছে। মুখখানা ফর্সা। তাতে ঘন দাড়ি – বেশিরভাগই কালো, শুধু এখানে-ওখানে হাতেগোনা কয়েকটা সাদা। হারিকেনের কমলা আলোয় সেই সাদা দাড়িগুলো রূপোর সূক্ষ্ম তারের মতো ঝিলমিল করছে।
জুলফার মনে বিভ্রান্তি কাজ করে। এ কি সত্যিই সেই বর যার সাথে তার বিয়ে ঠিক হয়েছে? নাকি সে ভুল জায়গায় এসে পড়েছে? তার হৃদস্পন্দন এত বেড়ে যায় যে মনে হয় বুকের ভেতরে একটা ঢোল বাজছে।
শব্দরও থমকে গেছে জুলফাকে দেখে। সে প্রত্যাশা করেনি, জুলফা এখানে আসবে। এই প্রথম তার সাথে জুলফার সামনাসামনি দেখা হলো। এতদিন সে শুধু আড়াল থেকে দেখত, দূর থেকে। জুলফার অপ্রত্যাশিত উপস্থিতি তাকেও একটু বিভ্রান্ত করে দিয়েছে।
জুলফা আস্তে আস্তে তার মুখের পর্দা সরিয়ে নেয়। পর্দার কাপড়টা তার হাতে কাঁপছে। সে নিশ্চিত হতে প্রশ্ন করে, ‘আপনি… আপনি কি আমার জন্য বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছেন?’
শব্দর মৃদু মাথা নাড়ে। তার চোখ দুটো ঈগলের মতো তীক্ষ্ণ হয়ে জুলফার দিকে স্থির। বাহ্যিকভাবে দেখতে কঠোর মনে হলেও তার চোখে মুগ্ধতা ছাড়া আর কিছুই নেই।
সঙ্গে সঙ্গে জুলফার চোয়াল শক্ত হয়ে যায়৷ সে আঙুল তুলে বলে, ‘তাহলে শুনে রাখুন ভালো করে, আপনি জমিদার হোন, কিংবা এ দেশের বাদশাহ হোন – তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই না। আপনাকে আমার পছন্দ হয়নি। আপনি স্বেচ্ছায় এই বিয়ে ভেঙে দেবেন। বুঝতে পেরেছেন?’
সে ইচ্ছা করেই আঙুল তুলে কথা বলেছে। যেন শব্দর রেগে যায়৷ যাই হোক না কেন সম্ভ্রান্ত ঘরের পুরুষরা এমন অপমান সহ্য করে না। কিন্তু শব্দরের প্রতিক্রিয়া তার প্রত্যাশার সম্পূর্ণ উল্টো হয়। তার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে ওঠে। সে মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করে জুলফার বড় বড় চোখ দুটো কীভাবে অস্থির হয়ে আছে। হাতের চুড়িগুলো কীভাবে টুং টাং করে বাজছে তার উত্তেজনায়।
শব্দর আস্তে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়, যেন বলতে চাইছে, ‘যেমন বলবেন আপনি।’
তার সম্মতি জুলফাকে আরও বিভ্রান্ত করে দেয়। সে থতমত খেয়ে যায়। লোকটা রাজি হয়ে গেল এত সহজে? সে একবার গাবুর দিকে তাকায়, যে এই পুরো দৃশ্য অবাক হয়ে দেখছিল। তারপর দ্রুত পা বাড়িয়ে চলে যেতে থাকে। শব্দরের অকপট সম্মতি তার সব ভাবনা এলোমেলো করে দিয়েছে।
শব্দর স্থির দৃষ্টিতে জুলফার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। পায়ের শব্দ ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে আসে। বিয়ের প্রস্তাব পাঠানোর পর থেকে তার মনে একটা দ্বিধা কাজ করছিল, সত্যিই এই বিয়েটা করবে কি না? কিন্তু এইমাত্র, জুলফার সাথে সংক্ষিপ্ত সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে তার সমস্ত সংশয় এক নিমিষে দূর হয়ে গেছে।
এমন তেজস্বী, সাহসী একজন নারী কখনো ছোট্ট নৌকায় কিংবা সাধারণ কুঁড়েঘরে মানিয়ে যেতে পারে না। এ তো তৈরি থাকার জন্য বিশাল রাজপ্রাসাদে! জুলফার সাহস, প্রত্যক্ষ কথাবার্তা তাকে আরও মুগ্ধ করেছে।
সে স্বগতোক্তি করে, ‘বুঝেছি, তোমাকেই আমি বিয়ে করব জুলফা, তোমাকেই।’
- ইলমা বেহরোজ


![মেঘের দেশে প্রেমের বাড়ি [শেষ পর্ব]](https://amarlekha.com/wp-content/uploads/2025/10/3cf51236-2d29-45c2-a963-4d58a217fde2.jpg)
![অটবী সুখ [পর্ব-০১]](https://amarlekha.com/wp-content/uploads/2025/11/aa823019-ffef-4aa7-9651-89294bd4fbe2.jpg)
![প্রজাপতি আমরা দুজন [পর্ব-০৮]](https://amarlekha.com/wp-content/uploads/2025/07/photo_6212761625384044921_y.jpg)