গুলনূরের চোখের কোণ বেয়ে নেমে আসা জলকণা গালের ওপর দিয়ে গড়িয়ে পড়ে একবিন্দু একবিন্দু করে। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, কষ্টের মাঝেও সে হাসছে! তার ঠোঁটের কোণ বিদ্রূপে ভরা। জাওয়াদের দিকে নির্ভীক দৃষ্টি মেলে, একদম সোজাসুজি চোখে চোখ রেখে, সে তার সেই হাসিকে আরও দীর্ঘ করে জাওয়াদের অস্থিরতাকে উসকে দিচ্ছে।
জাওয়াদের ভেতরে জমে থাকা ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে পড়ে। রাগে তার মস্তিষ্কের শিরা-উপশিরা কপকপ করে কাঁপতে থাকে। মুহূর্তের ঝটকায় গুলনূরের গলা থেকে নিজের হাত সরিয়ে নেয়। তারপরই হাতের দুই আঙ্গুল দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে গুলনূরের দুই গাল। চিৎকার করে বলে, ‘হাসি থামাও! এক্ষুনি থামাও বলছি! কী জানো তুমি? হাঁ? বলো! কতদিন ধরে জানো? ‘
গুলনূর তীব্র বেগে মাথা ঝাঁকায়। প্রচণ্ড শক্তিতে সে নিজের গাল মুক্ত করে নেয় জাওয়াদের খামচে ধরা হাতের বন্দিদশা থেকে। কর্কশ গলায় বলে, ‘আমি সব জানি। যা তুমি জানো, সেসবও আমার জানা। আর যেসব তুমি জানো না, জানতেও পারো না, সেসবও আমি জানি। আমার জ্ঞান তোমার চেয়ে বহুগুণ বেশি।’
জাওয়াদ যেন মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। এক পা পিছিয়ে যায়। পরক্ষণেই আবার এগিয়ে আসে দ্রুত পদক্ষেপে। সামনের দিকে ঝুঁকে দুই হাত দিয়ে গুলনূর যে চেয়ারে বসে আছে সেই চেয়ারের দুই হাতল শক্ত করে চেপে ধরে। মুখ গুলনূরের মুখের একেবারে কাছে নিয়ে এসে প্রায় বুক ফাটা আর্তনাদের মতো চিৎকার করে ওঠে, ‘কী জানো তুমি? এক্ষুনি বলো! সব বলো! এই মুহূর্তে বলো! তুমি আসলে কে? তোমার পরিচয় কী? আমার সাথে তোমার কীসের শত্রুতা? কেন করছ এসব? কী চাও তুমি?’
গুলনূর ঠোঁট বাঁকিয়ে ফের হাসে। যেন জাওয়াদকে এভাবে ছটফট করতে, অস্থির হতে, মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে দেখে সে তৃপ্তি পাচ্ছে, আনন্দ পাচ্ছে। ধীরে ধীরে মাথা দুলিয়ে, একগুঁয়ে গলায় উত্তর দেয়, ‘বলব না। আমি তোমাকে কিছুই বলব না। বেকার খাটছো।’
‘বলবে না?’
‘না।’
‘বলবে না?’
‘বললাম তো না।’
মানুষ যখন রাগের উন্মাদনায় আচ্ছন্ন হয়, তখন তার ভেতরের সমস্ত বিবেক-বুদ্ধি লোপ পায়। হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে। নিজের ব্যক্তিত্বের গণ্ডি ছাড়িয়ে অচেনা, ভয়ংকর মানুষে রূপান্তরিত হয়। নিজের কৃতকর্মের পরিণাম, নিজের কথার ভয়াবহতা অদৃশ্য হয়ে যায় ক্রোধের অন্ধকারে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেই গেছেন, রাগ মানুষের অন্তরকে কঠিন পাথরে পরিণত করে। সেই কঠিন পাথর হয়ে উঠছে জাওয়াদের হৃদয়। মাথার ভেতরে অনবরত বাজতে থাকে গুলনূরের বিষে ভরা কণ্ঠস্বর, ‘আমি কখনোই এমন কোনো ছেলেকে বিয়ে করতাম না, যার বাবার পরিচয়ের ঠিক নেই! যে একটা জারজ, বেজন্মা!’
কী ভয়ংকর, হৃদয়বিদারক শব্দগুলো! যে কথা শোনার ভয়ে জাওয়াদ দুটো বছর পালিয়ে বেড়িয়েছে, যে নিয়তির নিষ্ঠুর খেলা সহ্য করতে না পেরে সে পরিবার ছেড়েছে, আপনজনদের ছেড়ে দূরে চলে গেছে, দিনের পর দিন, রাতের পর রাত একাকী যন্ত্রণায় কাতরেছে — সেই কথা আজ গুলনূরের মুখ থেকে উচ্চারিত হয়েছে! প্রতিটি শব্দ ছুরির মতো বিঁধছে তার হৃদয়ে। ক্ষতবিক্ষত করছে তার আত্মসম্মানকে। রাগে, দুঃখে, অপমানে, অসহনীয় যন্ত্রণায় এবং সৃষ্টিকর্তার প্রতি জন্ম নেওয়া অভিমানে জাওয়াদের ভেতরে যা কিছু মানবিকতা অবশিষ্ট ছিল, সবকিছু বাষ্পের মতো উবে যায়। শুকিয়ে যায় সহানুভূতির শেষ বিন্দুটুকুও। ক্রোধ তাকে সম্পূর্ণভাবে অন্ধ করে তোলে। হঠাৎ সে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর ফিরে আসে হাতে মোটা দড়ি নিয়ে। রাসায়নিক তন্তুতে তৈরি শক্ত, খসখসে, রুক্ষ দড়ি। প্রবল শক্তিতে বেঁধে রাখা গুলনূরের দুই হাতের কব্জি আবারও শক্ত করে বেঁধে ফেলে। বেঁধে ফেলে দুই পা, গোড়ালির সাথে গোড়ালি একসাথে করে। তারপর তাকে কোলে করে নিয়ে যায় দালান বাড়িটির এক অভিশপ্ত ঘরের দিকে। যে ঘরটির একটা ভয়াবহ ইতিহাস আছে। ১৯৭১ সাল। মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত দিনগুলোতে পাষণ্ড পাকিস্তানি হানাদাররা এই বাড়িটি দখল করে নিয়েছিল। পুরো বাড়িটাকে তারা নির্যাতন কেন্দ্রে পরিণত করেছিল। প্রতিদিন ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত এখানে চলত অমানবিক অত্যাচার। গ্রামের নিরীহ মানুষদের, নিরপরাধ বাঙালি যুবকদের ধরে আনা হতো এখানে। সামান্য সন্দেহে, কখনো কোনো কারণ ছাড়াই। তাদের বেঁধে ঝুলিয়ে দেওয়া হতো ছাদের কড়িকাঠে। পায়ের নিচে মাটি থাকত না। দুই হাত উপরে তুলে মোটা শেকলে বাঁধা, শরীরের পুরো ভর ঝুলে থাকত কাঁধের ওপর। ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কখনো পুরো একদিন। শ্বাস নিতেও কষ্ট হতো। হাতের রগ ফুলে উঠত, রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যেত। অসহ্য যন্ত্রণায় চিৎকার করত তারা, কিন্তু কেউ আসত না। হানাদাররা হাসত, তামাশা করত, সিগারেট টানত আর উপভোগ করত সেই নির্যাতন। সেই একই ঘর। সেই একই কড়িকাঠ। এখনো আছে সিলিংয়ে লাগানো মোটা লোহার আংটা, যেখানে শেকল ঝুলত।
জাওয়াদ সেই একই স্থানে গুলনূরকে নিয়ে আসে। গুলনূরের বাঁধা দুই হাত উপরে তুলে, দড়ি পেঁচায় লোহার আংটায়। তারপর এক টানে তুলে দেয় উপরে। গুলনূরের পা মেঝে থেকে অনেকটা উপরে উঠে যায়। সে কোনো প্রতিবাদ করে না। চিৎকার করে না। সে নিশ্চুপ। শুধু পায়ের আঙুল ছড়িয়ে মাটি খুঁজছে, কিন্তু পাচ্ছে না। পুরো শরীরের ভার, সম্পূর্ণ ওজন এসে পড়ছে দুই কাঁধের ওপর। মনে হচ্ছে যেকোনো মুহূর্তে কাঁধের জোড় বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।
জাওয়াদ তার দিকে আঙুল তুলে রাগে গজগজ করতে করতে, দাঁত কিড়মিড় করে বলে, ‘যতক্ষণ না তুমি মুখ খুলছ, যতক্ষণ না সব কিছু আমাকে বলছ, ততক্ষণ এভাবেই ঝুলে থাকবে। এক ফোঁটা পানিও পাবে না। এক দানা খাবারও পাবে না। কিছুই পাবে না। শুকিয়ে মরবে এখানে। বুঝেছ? বুঝতে পেরেছ?’
বলেই সে দরজা পেরিয়ে বিক্ষিপ্ত পায়ে রাস্তায় নেমে পড়ে। চারপাশ নিস্তব্ধ। রাস্তায় একটি প্রাণীরও চলাচল নেই। একটা ঘৃণ্য, নোংরা দৃশ্য বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। নিজের মা’কে নিয়ে দেখা সেই অসহ্য স্মৃতি মস্তিষ্কে খোদাই করে রাখা। সারাক্ষণ জ্বলন্ত লোহার শলাকার মতো হৃদয়ে খোঁচাতে থাকে। সে হাঁটে। হাঁটতে থাকে। দ্রুত থেকে দ্রুততর হয়। পা কোথায় পড়ছে, কোনদিকে যাচ্ছে কিছুই জানে না। শুধু জানে, থামতে পারছে না। থামলেই সেই দৃশ্যটা তাকে গ্রাস করে ফেলবে। থামলেই তার রক্ত জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে।
রাস্তা ছেড়ে সে মাঠের দিকে ছুটে যায়। মাঠ পার হয়ে ঢুকে পড়ে একটা পাহাড়ি পথে। ঢালু পথ। পাথর আর শেকড় ছড়ানো। উঠতে থাকে পাহাড়ের চূড়ার দিকে। অবশেষে পৌঁছায় চূড়ায়। সেখানে দাঁড়িয়ে সে চারদিকে তাকায়। নিচে দূরে একটা গ্রাম দেখা যাচ্ছে। ছোট ছোট ঘর, যেন পিঁপড়ার বাসা। সেখানে মানুষ বাস করছে। স্বাভাবিক জীবন যাপন করছে। তার জীবনটাই আর স্বাভাবিক নেই।
হঠাৎ তার ভেতর থেকে বিকট আর্তনাদ বেরিয়ে আসে। আহত সিংহের মতো চিৎকার করে ওঠে। পুরো পাহাড় কেঁপে ওঠে সেই চিৎকারে। হাঁটু ভেঙে উবু হয়ে বসে পড়ে মাটিতে। দুই হাঁটু মুড়ে বুকের কাছে এনে আঁকড়ে ধরে। মাথা নিচু করে হাঁটুর মাঝে গুঁজে ফেলে। দুই হাত দিয়ে চুল চেপে ধরে প্রাণপণে। তারপর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে। চোখের জল গড়িয়ে পড়ে গালে, চোয়াল বেয়ে ঝরে পড়ে মাটিতে।
যেদিন প্রথম জেনেছিল নিজের জন্মের অভিশপ্ত সত্যটা। সেদিনও ঠিক এভাবেই কেঁদেছিল। হাঁটতে শুরু করেছিল গন্তব্যহীন। কোথাও যাওয়ার ছিল না, তবু পা চলছিল। শুধু মাইলের পর মাইল হেঁটেছে। কখন সন্ধ্যা হচ্ছে, কখন আকাশ লাল হয়ে উঠছে, কখন সূর্য ডুবে যাচ্ছে পশ্চিমে কিছুই টের পায়নি। কখন রাত নেমে এসেছে চারপাশে তাও টের পায়নি।
হেঁটে হেঁটে পৌঁছে গিয়েছিল নদীর ধারে। চাঁদ উঠেছিল আকাশে। পূর্ণিমার চাঁদ। তার আলো পড়ছিল জলের বুকে। রুপালি ঝিলিক খেলছিল ঢেউয়ের সাথে তাল মিলিয়ে। দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছিল তরল রূপা বয়ে যাচ্ছে। জাওয়াদ বিনা চিন্তায়, বিনা দ্বিধায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ঠান্ডা জলে। নদীর শীতল স্পর্শও ভেতরের জ্বালা কমাতে পারেনি। এলোমেলো সাঁতরাতে শুরু করেছিল। কোনো পরিকল্পনা ছিল না। শুধু হাত-পা ছুড়েছে জলে। ডুব দিয়েছে, আবার ভেসে উঠেছে। মুখে জল ঢুকেছে। কাশি দিয়েছে। তবু থামেনি। সাঁতরেছে আর হুহু করে কেঁদেছে।
কতক্ষণ সাঁতরেছিল? কোনো হিসাব রাখেনি। হয়তো এক ঘণ্টা, হয়তো দুই। হয়তো আরও বেশি। যতক্ষণ না তার হাত-পা অবশ হয়ে এসেছিল। যতক্ষণ না পেশি চিৎকার করে উঠেছিল ব্যথায় ততক্ষণ সাঁতরেছে। ক্লান্ত হয়ে একসময় স্রোতের বিপরীতে লড়াই করে হামাগুড়ি দিয়ে উঠে এসেছিল একটা নির্জন বালুচরে। হাতে পায়ে জোর ছিল না। কোনোমতে বুক দিয়ে হেঁচড়িয়ে উঠেছিল চরের উপর। শুয়ে পড়েছিল সেই বালুর বিছানায়। মাথার উপর তখন অসীম আকাশ। অগণিত তারা। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল আকাশের দিকে।
ভোর হতে হতে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল। কান্তারপুরে আর একদিনও থাকতে পারবে না। এখানে তার অস্তিত্বই এক প্রহসন। সেদিনই গ্রহণ করেছিল দুই বছরের নির্বাসিত জীবন।
আজ, আবার সেই পুরনো ক্ষত খুলে গিয়েছে। ফেটে রক্ত ঝরছে। গুলনূর তার ক্ষতে লবণ ছিটিয়ে দিয়েছে। ইচ্ছাকৃতভাবে। এমনভাবে জারজ বলেছে! বেজন্মা বলেছে! যেন সে কোনো মানুষই নয়। সে শুধুই একটা জারজ!
এই মানুষটাকেই কি না সে গত দুই মাস ধরে উন্মাদের মতো খুঁজেছে! রাত-দিন এক করে দিয়েছে! পাগলের মতো ছুটে বেড়িয়েছে গ্রাম থেকে গ্রামে, শহর থেকে শহরে! কত জায়গায় খোঁজ নিয়েছে! আক্ষেপের দংশনে জাওয়াদের পুরো শরীর কুঁকড়ে ওঠে। এক হাত মুষ্টিবদ্ধ করে পুরো শক্তি দিয়ে আঘাত করে মাটিতে। প্রথম আঘাতে শক্ত মাটি কেঁপে ওঠে। ব্যথা ছড়িয়ে পড়ে কব্জিতে। আবার আঘাত করে। পরপর ছয়বার। হাতের গাঁটে তীব্র ব্যথা ছড়িয়ে পড়ে। শরীর ঘামতে থাকে। শার্ট এক হ্যাঁচকা টানে খুলে ছুঁড়ে ফেলে দূরে। খোলা বুকে সরাসরি পাহাড়ের শীতল হাওয়া লাগে। ধীরে-ধীরে উন্মত্ততা কমে আসে। রাগের তীব্রতা স্তিমিত হয়। তখন কারো পায়ের শব্দ ভেসে আসে পেছন থেকে। স্পষ্টভাবে শোনা যাচ্ছে শুকনো পাতার খসখসানি। মাটিতে পায়ের ছাপ পড়ার মৃদু আওয়াজ। কেউ উঠে আসছে পাহাড়ের পথ ধরে। জাওয়াদ চমকে উঠে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকায়।
কান্তারপুর।
শব্দরের কথা শুনে লতিফ হোহো করে হেসে ওঠে। সেই হাসি প্রতিধ্বনি তুলে দূরবর্তী আমবাগান পর্যন্ত পৌঁছে যায়। বাগানের সবুজ ছায়ায় পরিশ্রমে মগ্ন দাসীরা তাদের কাজ থামিয়ে কৌতূহলী দৃষ্টিতে এদিকে মুখ ঘুরিয়ে তাকায়।
লতিফ হাসি থামিয়ে বিস্ময়ের সুরে বলে, ‘তোকে পছন্দ করে না? এমন অবিশ্বাস্য কথাও তুই সত্যি বলে আমাকে বিশ্বাস করতে বলছিস?’
শব্দর বিষণ্ণ মুখে দূর দিগন্তের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, ‘যা সত্য, যা বাস্তব, তা-ই বললাম।’
লতিফ হাসি থামিয়ে কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করে, ‘সত্যিই কি ভাবিজান তোকে পছন্দ করেন না? একেবারে অন্তর থেকে, মন থেকে অপছন্দ করেন? নাকি তুই ভুল বুঝছিস?’
‘ঠিক বুঝে উঠতে পারি না। কখনো কখনো মনে হয় জুলফার অন্তরের কোথাও না কোথাও আমার প্রতি সামান্য একটু স্নেহ আছে, কিছুটা মমতা আছে। কিন্তু সেই অনুভূতিগুলোও দুই মাস আগের ঘটনা। এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। সম্পর্কটা আরও বেশি শীতল হয়ে গেছে, আরও বেশি দূরত্ব তৈরি হয়েছে। মাঝে মাঝে মনে হয় আমাকে ও মানতেই পারে না, সহ্য করতে পারে না।’’
শব্দরের চওড়া বুক থেকে একটা ভারী দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। সে তার পরিপাটি সাদা পাঞ্জাবির হাতা কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে নেয়।
বিকেলের সোনালি রোদের কোমল আলো তার শান্ত মুখে এসে পড়ে একটা স্নিগ্ধ, উজ্জ্বল আভা ছড়িয়ে দিচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে অন্তরে চাপা থাকা কষ্টের কথা অবশেষে বিশ্বস্ত কাউকে খুলে বলতে পেরে মন খানিকটা হালকা বোধ হচ্ছে যেন। একটা স্বস্তি আসছে।
লতিফ বলে, ‘তোকে পছন্দ না করার কী কারণ থাকতে পারে ভাবিজানের? সেটাই তো আমি ভেবে পাচ্ছি না। তুই সৎচরিত্রের অধিকারী, সুপুরুষ, সুদর্শন, ভদ্র, সুশিক্ষিত একজন মানুষ। তোর কোনো অর্থনৈতিক অভাব-অনটনও নেই। তাহলে?’
‘বয়স বেড়ে গেছে, এটাই কি যথেষ্ট নয় অপছন্দের কারণ হিসেবে? যুগ কি আর আগের মতো আছে? এখনকার নারীরা অল্প বয়সের, তরুণ পুরুষদের পছন্দ করে। বয়স্ক পুরুষ তাদের কাছে আকর্ষণহীন।’
‘কত আর বয়সের ব্যবধান হবে তোদের মধ্যে? বড়জোর কুড়ি-বাইশ বছর হবে।’
‘বল চব্বিশ-পঁচিশ বছর।’
‘তাতে কী এমন ক্ষতি হয়েছে? তুই এখনও দেখতে পুরুষোত্তম, তেজস্বী। দেখ না, তোর পাশে দাঁড়ালে আমাকেই বুড়ো, জীর্ণ মনে হয়। আমি সত্যিই বুড়ো হয়ে গেছি। কিন্তু তুই এখনও…’
‘থাম। এসব কথা শুনে আর সুখ পাই না। ভালো লাগে না।’
লতিফ থামে না। সে শব্দরের দিকে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে যুক্তি দিয়ে বলার চেষ্টা করে, ‘বিয়ে যখন হয়েই গেছে, এখন আর বয়স নিয়ে ভেবে লাভ আছে? বয়সের ব্যবধান নিয়ে দুঃখ করে কী হবে? বলতো, তুই কি কখনো নিজের বয়সটা ভুলে গিয়ে ভাবিজানের বয়সে নেমে যাওয়ার চেষ্টা করেছিস? উনার মনোরঞ্জনের, উনাকে খুশি করার চেষ্টা করেছিস? উনার পছন্দের জিনিসগুলো, উনার আগ্রহের বিষয়গুলো জানার…সেগুলো করার চেষ্টা করেছিস?’
দুজন কথা বলতে বলতে বাড়ির প্রশস্ত আঙিনা ছেড়ে পেছনের বিস্তীর্ণ, খোলা মাঠের দিকে চলে এসেছে। সতেজ সবুজ ঘাসে আচ্ছাদিত পুরো মাঠটি। একটা প্রশান্তি ছড়িয়ে আছে চারপাশে। দূরে কয়েকটি গাভী নিবিষ্ট মনে ঘাস খেতে খেতে চরে বেড়াচ্ছে।
শব্দর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ‘আমি আমার সবটুকু সামর্থ্য দিয়ে চেষ্টা করেছি লতিফ। ও’কে রাজরাণীর মতো রেখেছি। দামি স্বর্ণালংকার, রেশমি শাড়ি, আরাম-আয়েশ, ভরণপোষণে কোনো ধরনের ত্রুটি, কোনো কমতি রাখিনি। স্বামী হিসেবে যত দায়িত্ব, যত কর্তব্য, স্ত্রী হিসেবে জুলফার যত অধিকার, সবকিছু পূরণের সর্বাত্মক চেষ্টা করেছি। আর কী করব বল? আর কী করার আছে?’
লতিফ একটা কচি ঘাসের ডগা মাটি থেকে তুলে নিয়ে অভ্যাসবশত মুখে পুরে দেয়। চিবুতে চিবুতে বলে, ‘এসব তো শুধু বাইরের দিক। ভেতরটা, মনের খবর কতটুকু রেখেছিস? ভাবিজান সবচেয়ে বেশি কী পছন্দ করেন, কীসে তার প্রাণ জুড়ায়? সেটা কি তুই কখনো জানার চেষ্টা করেছিস?’
শব্দর একটু ভেবে বলে, ‘ঘুরতে। এদিক-ওদিক ছুটে বেড়াতে, মুক্ত বাতাসে হাঁটতে খুব ভালোবাসে। খোলা জমিতে বড় হয়েছে তো। গ্রামের বাইরে, হাটে-বাজারে, নদীর পাড়ে, মেলায় যেতে, মানুষজনের সাথে মিশতে ভালোবাসে। চার দেয়ালের মধ্যে, ঘরের ভেতর বেশিক্ষণ থাকতে পারে না। দমবন্ধ লাগে ওর।’
লতিফ রসিকতা করে বলে, ‘তোর কোনো শারীরিক সমস্যা নেই তো?’
শব্দর চমকে লতিফের দিকে ঘুরে তাকায়। যেন চোখ কোঠর থেকে বেরিয়ে আসবে৷ বলে, ‘কী বললি তুই? শারীরিক সমস্যা? আমার?’
লতিফ কাঁধ ঝাঁকিয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলে, ‘আরে ভাই, জানতে চেয়েছি। মানে…পুরুষত্বে কোনো সমস্যা আছে কি না? কারণ অনেক সময় দেখা যায়…’
‘থাম! থাম!’ শব্দর প্রায় চিৎকার করে ওঠে। তার মুখ রাঙা হয়ে যায় যখন বলে, ‘কী সব আজগুবি কথা বলছিস! আমার কোনো শারীরিক সমস্যা নেই। একদমই নেই!’
লতিফ হাসি চেপে নিরীহ গলায় বলে, ‘ও, ভালো। আসলে ভাবলাম হয়তো সেই কারণে ভাবিজান…’
শব্দর রাগত স্বরে আত্মবিশ্বাসের সাথে বলে, ‘আমার সবকিছু ঠিকঠাক আছে। আল্লাহর রহমতে পুরোপুরি সুস্থ, সবল, সক্ষম।’
‘বেশ, বেশ! রাগ করছিস কেন? শুধু নিশ্চিত হতে চাইছিলাম। কারণ অনেক সময় দেখা যায় বয়স হলে পুরুষদের…’
‘লতিফ, তুই যদি এক্ষুনি চুপ না করিস, তাহলে এই মাঠেই তোকে প্রমাণ করে দেখিয়ে দেব!’
লতিফ এমন একটা ভাব ধরে যেন সে প্রস্তুত প্রমাণ দেখার জন্য। শব্দর থতমত খেয়ে বলে, ‘কথার কথা।’
লতিফ হাসতে হাসতে দুহাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গি করে বলে, ‘ঠিক আছে, ঠিক আছে! বুঝেছি। তোর কোনো সমস্যা নেই। আমি তো শুধু…’
‘তুই শুধু আমার মাথা খাচ্ছিস!’
কথাটা বিরক্ত হয়ে বললেও শব্দরের ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা দেখা যায়। লতিফ তার কাঁধে হাত রেখে বলে, ‘তোর কোনো শারীরিক সমস্যা নেই, টাকা-পয়সার সমস্যাও নেই, তাহলে সমস্যাটা কোথায়? হৃদয়ে। তুই আসলে ভাবিজানের মন জয় করতে পারিসনি। সেটা তোর বয়সের জন্য না, সেটা তোর দৃষ্টিভঙ্গির জন্য।’
শব্দর উৎসুক হয়ে তাকায়।
‘তুই কখনো ভাবিজানকে সাথে নিয়ে ছুটে বেরিয়েছিস? উনি যেদিকে যেতে চান, যেখানে যেখানে যেতে চান সেদিকে নিয়ে গেছিস? একসঙ্গে অনেকক্ষণ ধরে হেঁটেছিস, ঘুরেছিস? সময় কাটিয়েছিস?’
শব্দর থমকে যায়। কথা খুঁজে পায় না। গলা খাঁকারি দিয়ে অস্পষ্ট স্বরে উত্তর দেয়, ‘না।’ পরমুহূর্তেই অস্বস্তি কাটাতে তাড়াতাড়ি করে যুক্তি দেখিয়ে যোগ করে, ‘কিন্তু অনুমতি তো দিয়ে রেখেছি। সম্পূর্ণ স্বাধীনতা আছে ওর। যখন খুশি, যেখানে খুশি যেতে পারে। আমি কখনো বাধা দিইনি, নিষেধ করিনি।’
‘কিন্তু তুই তো উনার সঙ্গী হোসনি, সাথী হোসনি। মনোরঞ্জনের চেষ্টা করেছিস ঠিক আছে, কিন্তু ভাবিজানের যা সত্যিকার অর্থে প্রিয়, যা উনার হৃদয়কে স্পর্শ করে তাতে কখনো নিজে সহযোগী হোসনি, অংশীদার হোসনি। কাউকে আকৃষ্ট করতে হলে, তার মন জয় করতে হলে, তার হৃদয় পেতে হলে প্রথমে তার অভিরুচি জানতে হয়, তার পছন্দ-অপছন্দ বুঝতে হয়, এবং সেই অভিরুচির সহচর, সেই আনন্দের সাথী হতে হয়। একসাথে হাসতে হয়, কাঁদতে হয়, একসাথে স্বপ্ন দেখতে হয়, স্বপ্ন বুনতে হয়।’
শব্দর একটু বিব্রতবোধ করে। বলে, ‘কখনো ওইভাবে প্রেম-ভালোবাসায় জড়াইনি। তাই আমার এসব বিষয়ে কোনো অভিজ্ঞতাও নেই।’
‘আমি শিখিয়ে দেব। এখন থেকে আমি যা যা বলব, যা যা পরামর্শ দেব, তুই সেসব মনোযোগ দিয়ে শুনবি আর মানবি। তারপর দেখব, ভাবিজান কীভাবে তোর প্রেমে, তোর মুগ্ধতায় না পড়েন। চ্যালেঞ্জ আমার, একমাসে প্রেমে পড়বে৷ তিনি কি জানেন, এই শব্দরের জন্য এককালে কত নারী বিষপানে প্রস্তুত ছিল? কত নারীর হৃদয় ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল?’
শব্দর লাজুক হাসি দিয়ে সামনের সবুজ মাঠের দিকে তাকিয়ে অস্বীকার করার মতো করে বলে, ‘যত্তসব বাজে কথা।’
লতিফ দক্ষ জহুরির মতো শব্দরের পুরো চেহারা পর্যবেক্ষণ করতে থাকে। তার চোখ সরু হয়ে আসে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে শব্দরের শরীরের প্রতিটি অংশ বিশ্লেষণ করে দেখে বলে, ‘দাঁড়িটা কেটে ফেলতে হবে। আর এই সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা ছেড়ে আমার মতো আধুনিক পোশাক পরতে হবে। শার্ট-প্যান্ট পরে স্মার্ট হতে হবে।’
শব্দরের চোখ যেন বিস্ফারিত হয়ে যায়। বলে, ‘দাঁড়ি কেটে ফেলব! কী উদ্ভট কথাবার্তা বলছিস! এই বয়সে এসে ওমন ছেলেমানুষি নখরামি করতে পারব না। লোকজন কী বলবে? প্রতিবেশীরা কী ভাববে? সমাজে মুখ দেখাব কী করে?’
‘এই বয়সে হাঁটু বয়সী মেয়েকে বিয়ে করার সময় লোকের কথা ভেবেছিলি? তখন কি সমাজের মুখ দেখার চিন্তা করেছিলি? তখন কি নখরামি মনে হয়নি?’
অভিমানে মুখ ভার করে তাকায় শব্দর। রাগের ভান করে কিছু বলতে যেতেই লতিফ দুষ্টুমি ভরা হাসি হাসতে হাসতে পিছিয়ে যেতে থাকে। বলে, ‘কী মশাই? রাগ হয়ে গেল? সত্য কথা শুনে সহ্য হলো না?’’
শব্দর আর থাকতে না পেরে তেড়ে যায় বন্ধুর দিকে। লতিফ হাসতে হাসতে উল্টো দিকে প্রাণপণে দৌড়ে পালাতে শুরু করে। দৌড়াতে দৌড়াতে, হাঁপাতে হাঁপাতে মনে পড়ে যায় পুরনো স্মৃতি। তাদের ছিল ছয়জনের একটা দুরন্ত দল। দলের যে ছেলেটি যে মেয়েটিকেই পছন্দ করত, মন দিত, সেই মেয়েটি কেন যেন শেষ পর্যন্ত শব্দরের দিকেই আকৃষ্ট হয়ে পড়ত। শব্দরের সুশ্রী চেহারা, তার ভদ্র ও নম্র স্বভাব, কথা বলার মিষ্টি ভাষা চুম্বকের মতো টেনে রাখত তাদের। মেয়েরা তার প্রেমে পড়ত প্রথম দেখাতেই। কিন্তু আজ দেখো কী নির্মম বিড়ম্বনা! যার জন্য একসময় গ্রামের সমস্ত যুবতী মেয়েরা পাগলপ্রায় হয়ে যেত, যার একটি দৃষ্টির জন্য কাতর হয়ে থাকত ;আজ সেই শব্দরের নিজের স্ত্রীই তাকে পছন্দ করে না, তাকে চায় না। এ কী আশ্চর্য খেলা খেলছে বিধাতা!
জীবনে কোনো কিছুই স্থায়ী নয়, চিরকালের নয়। আজ যে ক্ষমতায়, প্রভাবে, প্রতিপত্তিতে আছে, কাল সে হয়তো অসহায়, দুর্বল। আজ যে সবার প্রিয়পাত্র, সবার মনের মানুষ, কাল সে হয়তো সবার কাছে অবহেলিত, পরিত্যক্ত। তবুও কেন মানুষের এত দাম্ভিকতা, এত অহমিকা? কেন এত অহংকার, এত গর্ব? সবকিছুই তো ক্ষণস্থায়ী, ধূলিসাৎ হয়ে যাওয়ার, সবকিছুই নশ্বর, মায়াময়।
পায়ের শব্দ শুনে জুলফা ঘাড় ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকায়। শব্দর এসে দাঁড়িয়েছে দোরগোড়ায়। দুজনের চোখাচোখি হয়। জুলফার চোখদুটো আজ শব্দরকে একটা নতুন আলোয় দেখছে। একজন প্রেমিকার চোখে যেভাবে তার প্রিয়জনকে, তার সবকিছুকে দেখা হয়, ঠিক সেরকম একটা দৃষ্টি। এই মানুষটা না থাকলে তার কী হতো! কোথায় গিয়ে দাঁড়াত তার জীবন! কোন অন্ধকারে তলিয়ে যেত! যে পরিবার তাকে বুকে জড়িয়ে রাখার কথা, স্নেহে-মমতায় আগলে রাখার কথা সেই পরিবারই তাকে বিক্রি করে দিতে চেয়েছিল কোনো এক বৃদ্ধ, লম্পট মানুষের কাছে। রক্ষিতা বানিয়ে রাখত তাকে। সেখানে অনাদরে, অবহেলায় একজন নিচু বেশ্যার মতো অপমানিত হয়ে কষ্টে দিন কাটত তার। চিন্তাটা যতবার মাথায় আসছে, ততবারই পুরো শরীরের ভেতর দিয়ে বরফ ঠান্ডা স্রোত বয়ে যাচ্ছে। গা ভয়ে, আতঙ্কে শিউরে উঠছে। একইসাথে কেন যেন অপরাধবোধও জন্মাচ্ছে। নিজের কৃতকর্মের জন্য যন্ত্রণায়, অনুশোচনায় ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠছে বারবার। সে কি নাভেদের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে ভুল করে ফেলল? কিন্তু ভালোবাসা কী করে ভুল হতে পারে! নাভেদ আর সে একে-অপরকে ভালোবাসে। পাগলের মতো ভালোবাসে। তাহলে তাদের দোষটা ঠিক কোথায়? অপরাধটা কোথায়? তাদের ভালোবাসার মধ্যখানে শব্দর এসে পড়েছে! নাকি আসলে মধ্যখানে এসে পড়েছে নাভেদ? কোনটা সত্যি? কোনটা বাস্তব? জুলফার অস্থির হৃদয়ে উথাল-পাতাল ঢেউ উঠছে একটার পর একটা। এই দ্বন্দ্ব তার প্রথম থেকে। এই দ্বন্দ্ব নিয়েই সে একইসঙ্গে দুটো সম্পর্ক বয়ে বেড়াচ্ছে!
জুলফার সুন্দর শরীরে সবুজ রঙের তাঁতের শাড়ি। বড় জানালা দিয়ে উজ্জ্বল রোদ এসে পড়েছে শাড়ির আঁচলের উপর। ঝিকমিক করছে। কানে দুলছে টানা সোনার দুল, নাকে পরা আছে ছোট্ট মিহি নথ। জমিদার বাড়ির জমকালো, রাজকীয় আবহ তার স্বাভাবিক সৌন্দর্যকে দশগুণ… বিশগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। অপরূপ লাগছে তাকে। শব্দর মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে জুলফার দিকে।
দুজনের মাঝখানে দূরত্ব ক্রমশ কমতে থাকে। হঠাৎ করে মনের ভেতরে টং করে একটা সতর্কতার ঘণ্টা বাজে। স্মৃতি ফিরে আসে। সেলিম বলেছিল, সে জুলফাকে দেখেছে কারো সাথে! কোনো এক অপরিচিত পুরুষের সাথে! তারপরই আরেকটা তীক্ষ্ণ ঘণ্টা বাজে মাথায়, জুলফা তাকে স্পষ্ট করে বলেছিল, গতকাল বাইরে গিয়েছিল। কিন্তু শঙ্খিনী ঠিক উল্টো কথা বলেছে! তারা নাকি বাইরে যায়নি!
কেন? কেন এই মিথ্যা? মানুষ মিথ্যা বলে কিছু না কিছু আড়াল করার জন্য! কী এমন গোপন বিষয় লুকোচ্ছে ওরা? সন্দেহ ভীষণভাবে পীড়া দিচ্ছে ভেতরে, তীক্ষ্ণ কাঁটার মতো বিঁধছে। জুলফা কি সত্যিই কিছু লুকাচ্ছে তার কাছ থেকে? গতকাল রাত থেকে একদণ্ড, এক মুহূর্তও শান্তি মিলছে না। সারারাত চোখে ঘুম আসেনি। মনটা অস্থির হয়ে আছে।
শব্দর একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে জুলফার দিকে। তার মুখ পড়ার চেষ্টা করে। কিন্তু কিছুই বুঝতে পারে না। কী নিষ্পাপ, কী নির্মল, কী পবিত্র ওই মুখ! কোনো অপরাধবোধের চিহ্ন নেই সেখানে। কোনো মিথ্যার ছায়া নেই। সে এগিয়ে যায় জুলফার দিকে। দুই হাতে খুব আলতো করে জুলফার দুই গাল ধরে মাথা নিচু করে ডান গালে একটা চুমু দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে, ‘আমি তোমাকে বিশ্বাস করি।’
তারপর বাম গালে আরেকট চুমু এঁকে দিয়ে আবার বলে, ‘আমি তোমাকে বিশ্বাস করি।’’
জুলফার হৃদয়ে ধক করে কাঁপন লাগে। পুরো শরীর শিউরে ওঠে শঙ্কায়। বিশ্বাসের কথা আসছে কেন হঠাৎ করে? উনি কি কিছু টের পেয়ে গেছেন? সন্দেহের বিষাক্ত বিষ কি ছড়িয়ে পড়েছে উনার মনে, চিন্তায়, শিরা-উপশিরায়? মুখ তাৎক্ষণিক মৃতের মতো সাদা হয়ে যায় জুলফার।
শব্দর ইচ্ছে করেই এই সন্দেহের বীজটা জুলফার ভেতরে ঢুকিয়ে দিতে চেয়েছে। নিজের অজান্তেই সে ভয় পাচ্ছে কোনো ভয়ংকর সত্যের মুখোমুখি হতে। তার মনের গভীরে একটা প্রবল ভয় কাজ করছে, কুরে কুরে খাচ্ছে। তাই আগেই নিজের আচরণের মাধ্যমে যেন জুলফাকে সাবধান করে দিচ্ছে, ‘সাবধান, জুলফা। সতর্ক থাকো। যা লুকিয়ে রেখেছ, সেটা বলে দাও। স্বেচ্ছায় নিজে থেকে বলে দাও। আমি তোমাকে বিশ্বাস করতে চাই।’
কিন্তু বিশ্বাস আর সন্দেহ কখনো একসাথে, পাশাপাশি থাকে না। থাকতে পারে না। দুটোর মধ্যে একটা অবশ্যই ভয়ংকরভাবে আঁকড়ে ধরে মনের সব কোণ। সব জায়গা দখল করে নেয়।
জুলফা একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারে না। মুখে কথা জমাট বেঁধে যায়। শুধু হতভম্ব হয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে শব্দরের দিকে।
শব্দর পেছন ফিরে আলমারির দিকে দ্রুত পায়ে এগিয়ে যায়। ঝটকা দিয়ে আলমারি খুলে জরুরি কাগজপত্র খুঁজতে থাকে, বের করতে থাকে একটার পর একটা। তারপর গম্ভীর সুরে বলে, ‘বাড়ির বাইরে বেরোবে না। একপাও না। আমার ফিরতে রাত হবে।’
জুলফা অস্ফুট স্বরে কোনোমতে জিজ্ঞেস করে, ‘কেন? কেন বেরোব না? কারণটা কী?’
শব্দর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে একবার তাকিয়ে কর্কশ গলায় বলে, ‘যা বলছি ঠিক তাই করো। কথার যেন কোনো নড়চড়, কোনো অবাধ্যতা না হয়।’
বলতে বলতে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। পেছনে ফিরেও তাকায় না একবার। জুলফা ধপ করে বসে পড়ে পালঙ্কের কিনারায়। আজ তাকে বেরোতেই হবে!
শব্দর বাড়ির চৌকাঠ পেরিয়ে সোজা পেছনের বনে চলে আসে। গাবু দাঁড়িয়ে ছিল বাঁশঝাড়ের নিচে। শব্দরকে দেখেই মাথা নুয়ে বলে, ‘সালাম হুজুর।’
শব্দর গাবুর হাতে কাগজপত্রের গাদা গুঁজে দিয়ে বলে, ‘এগুলো নিয়ে যা আড়তে, নাভেদের হাতে দিবি। আজ আমি আসব না।’
গাবু প্রশ্নবোধক চাহনি নিয়ে তাকায়। জবাব না পেয়ে মাথা নিচু করে চলে যায়। গাবু অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার পর শব্দর মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয়, আজ সারাদিন সে বনেই কাটাবে। চোখ রাখবে বাড়ির দিকে। জুলফা যদি বাড়ি ছেড়ে বের হয়, তবে সুরঙ্গ পথ দিয়েই বেরোবে। সামনের দরজা দিয়ে বের হবে না। সে দেখতে চায়, জুলফা আসলে কোথায় যায়! তার আদেশ অমান্য করে সত্যিই বাইরে পা রাখে কি না! আর যদি সত্যি সত্যি বের হয়ই, তাহলে কিসের টানে? কার আহ্বানে? কোন আকর্ষণ তাকে টেনে নিয়ে যায়?
সঙ্গে নিয়ে এসেছে পানির মাটির পাত্র, ঠান্ডা জল ভরা। আর কিছু শুকনো খাবার। মুড়ির পুটলি, চিঁড়ের থলে, গুড়ের ডেলা। সারাদিনের খাবার-দাবারের ব্যবস্থা করে এসেছে। প্রয়োজন পড়লে সারারাতও থাকবে এখানে।
সে একটা বিশাল বটগাছের নিচে এসে দাঁড়ায়। গাছটা শত বছরের পুরনো, তার ঝুরি শিকড় নেমে এসেছে মাটি পর্যন্ত, মোটা মোটা থাম হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে গাছের পেছনে আশ্রয় নেয়, শিকড়ের মোটা দেয়ালে পিঠ ঠেস দিয়ে বসে পড়ে। বসার জায়গাটা আরামদায়ক। এখান থেকে সুরঙ্গের মুখটা একদম স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। বুকে যে সন্দেহের বীজ রোপিত হয়েছে তার শেষ দেখা না পর্যন্ত সে শান্তি পাবে না।
ইলমা বেহরোজ


![মেঘের দেশে প্রেমের বাড়ি [শেষ পর্ব]](https://amarlekha.com/wp-content/uploads/2025/10/3cf51236-2d29-45c2-a963-4d58a217fde2.jpg)
![অটবী সুখ [পর্ব-০১]](https://amarlekha.com/wp-content/uploads/2025/11/aa823019-ffef-4aa7-9651-89294bd4fbe2.jpg)
![প্রজাপতি আমরা দুজন [পর্ব-০৮]](https://amarlekha.com/wp-content/uploads/2025/07/photo_6212761625384044921_y.jpg)