দেশজুড়ে তখন নেমে এসেছে নিদারুণ দুর্ভিক্ষ। খাদ্যের তীব্র সংকটে গোটা জনপদ কাতরাচ্ছে। গ্রামে গ্রামে, শহরে বন্দরে শোনা যায় উদ্ভ্রান্ত মানুষের আর্তনাদ। সাধারণ গরিব মানুষেরা একবেলা খেয়ে বাকি দুই বেলা অনাহারে কাটায়। আর এই মহাবিপর্যয়ে বেদে সম্প্রদায়ের মতো সমাজের প্রান্তিক মানুষেরা পড়ে যায় আরও গভীর সংকটে।
বিশাল নৌকার মধ্যেও প্রকট হয়ে ওঠেছে সমাজের নির্মম শ্রেণিবিভাজন। জুলফা আর তার ভাবি বৈশাখি বসেছে নৌকার পেছনের পাটাতনে, যেখানে ঠাঁই হয়েছে তাদের মতো আরও দরিদ্র ও নিম্নবর্গীয় মানুষদের। তাদের পোশাক-আশাক ময়লা, ছিঁড়ে-ফাটা। অভুক্ত মুখগুলো শুকিয়ে কাঠের মতো হয়ে গেছে। বিপরীত দিকে নৌকার অগ্রভাগে আরামে বসে আছে ধনী ব্যবসায়ী ও উচ্চবিত্ত মানুষেরা। তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ, চেহারা দেখে মনে হয় যেন এই দুর্ভিক্ষ তাদের স্পর্শই করেনি।
শব্দর খোশমেজাজে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিল। হঠাৎ তার নজর পড়ে জুলফার দিকে। প্রথমে চিনতেই পারে না তাকে। বোরকা-হিজাবে ঢাকা দেহ। মনেই হচ্ছে না এই সেই প্রাণবন্ত বেদেকন্যা! যেন কোনো সাধারণ দরিদ্র পরিবারের সুন্দরী কন্যা। তীব্র রোদে আর কষ্টে তার চোখমুখ কুঁচকে আছে। মুখে দুঃখের ছাপ স্পষ্ট। নৌকার এক লোক কিছু একটা বলতেই দুজন উঠে গিয়ে টয়লেটের পাশের পাটাতনে বসে।
শব্দর কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে খেয়াল করে, জুলফা কী যেন বলছে আর বারবার চোখ মুছছে হিজাবের কোণ দিয়ে। তার কৌতূহল জাগে। সে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ায়, বন্ধুদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিঃশব্দে জুলফার পেছনে গিয়ে বসে। কান পেতে শোনার চেষ্টা করে তাদের কথাবার্তা।
জুলফা তখন বিষাদমাখা কণ্ঠে তার ভাবিকে বলছে, ‘আমি আর কিছু চাইনে ভাবি। কোনো বড়লোকী চাইনে। সোনার গহনা চাইনে, সুন্দর শাড়ি চাইনে। শুধু চাই মায়ে, ভাইজানে, বইনে আর ছোট বাপজানে যাতে ভালো থাকে। রোজ তিনবেলা একমুঠো ভাত যদি পেট ভইরা খাইতে পারি সবাইরে নিয়া, তাইলেই আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ। ভাতই আমার চাওয়া, ভাবি। মাজারে আমি শুধু ভাতের জন্যিই মানত করতে চাই।’
বৈশাখি দীর্ঘশ্বাস ফেলে। জুলফা দূরের আকাশে তাকিয়ে স্বপ্নালু সুরে বলে, ‘আমি স্বপ্ন দেহি ভাবি, একদিন আমাগো নিজের একটা ছোট্ট ঘর হইব। মাত্র একটা ঘর। বড় হইতে হইব না। চার দেয়ালের মধ্যে আমরা নিরাপদে ঘুমাইতে পারব। ঝড়-বৃষ্টির ভয় থাকব না। কেউ আমাদের তাড়াইয়া দিতে পারব না। আমাগো মাথার উপর একটা চাল থাকব। আর দুনিয়ার কোনো বিলাসিতার প্রতি আমার কোনো লোভ নাই ভাবি। শুধু খাইয়া বাঁচতে পারলেই হয়। কুত্তা-বিলাই না…মানুষের মতো বাঁচতে চাই।’
বৈশাখি তার কাঁপা হাত ধরে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু তার নিজের চোখেও জল। সে চোখের জল মুছে বলে, ‘কী কমুরে বইনে, কতদিন যে ভাত খাই নাই । ভাতের গন্ধও ভুইলা গেছি। পেটে শুধু পানি। রাইতে ঘুম আহে না ক্ষুধায়। মাঝরাইতে পেটে এমন ব্যথা করে যে মনে হয় পেটটা ফাইটা যাইব। পোলায় কান্দে, দুধ পায় না। কী দিমু তারে? আমার কাছে তো কিছু নাই। আমার হাত দুইটা আছে, পা দুইটা আছে, কিন্তু কাজ নাই। মানুষে কাজও দেয় না। কইয়া দেয় – তোমরা বেদে, তোমাদের দিয়া কাজ হইব না।’
‘আমরাও তো মানুষ ভাবি। আমাগো রক্তও লাল। আমরাও কাঁদি, হাসি। তবু মানুষে আমাগোরে মানুষ মনে করে না। আমরা কী পাপ করছি? জন্মাইছি এইডাই পাপ?’
বৈশাখি আর কোনো কথা না বলে তাকে বুকে টেনে নেয়। দুই বোনের মতো তারা একে অপরের কাঁধে মাথা রেখে কাঁদতে থাকে নীরবে। তাদের গরম অশ্রু ফেরির পুরানো কাঠের পাটাতনে পড়ে মিশে যায়। এই দুর্ভিক্ষের কালে তাদের পরিবারের অবস্থা ভয়াবহ থেকে ভয়াবহতর হয়েছে। কাজের খোঁজে, খাবারের খোঁজে পরিবারের প্রতিটি সদস্য ভোর থেকেই ছুটে বের হয় বিভিন্ন দিকে। মা মান্নাত চলে যায় একদিকে – হয়তো কোনো বাড়িতে ঝাড়ুর কাজ পাবে বলে আশায়। জুলফার ভাই যায় অন্যদিকে – নদীর ঘাটে কুলির কাজের খোঁজে। জুলফা যাত্রাপালায় নাচে কিন্তু মানুষ টাকার অভাবে আসে না বলে সেখানেও আয় নেই। বৈশাখি ও জুঁইও তাদের নিজের পথ ধরে। সারাদিনের এই দৌড়াদৌড়িতে পরিবারের কারো সাথে কারো দেখা হয় না। রাতে যখন সবাই ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফেরে, তখনই জানা যায় কে কতটুকু সফল হয়েছে দিনের খোঁজে। অধিকাংশ দিনই অনেকে খালি হাতে ফেরে। আজ ভাগ্যক্রমে জুলফা আর বৈশাখির গন্তব্য এক হওয়ায় দুজনে একসাথে পথ চলার সুযোগ পেয়েছে। এই বিরল মুহূর্তে তারা মনখুলে নিজেদের দুঃখ-কষ্টের কথা বলতে পারছে, একে অপরের সাথে ভাগাভাগি করতে পারছে জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা। হাপুস নয়নে কাঁদতে পারছে, যা হয়তো অনেকদিন ধরে বুকে চেপে রেখেছিল।
আরও কিছুক্ষণ ঠায় বসে থেকে তাদের আলাপচারিতা শুনে শব্দর জানতে পারে, আজ তারা দুজনে নদীর ওপারের বিখ্যাত মাজারে যাচ্ছে মানত করতে। সেই মাজারের বিশেষ মর্যাদা আর বরকতের কথা শুনেছে তারা। সেখানে গিয়ে আল্লাহর কাছে শুধু একটাই প্রার্থনা জানাবে – যেন প্রতিদিন দুবেলা একমুঠো ভাত পেট ভরে খেতে পারে। এর চেয়ে বড় কোনো চাওয়া নেই তাদের। শব্দর এসব কথা শুনে মনে মনে ভাবে, কী পরিহাস! তার বাড়িতে তো খাবারের অভাব নেই। বরং প্রতিদিন অতিরিক্ত রান্না হয়, যার একটা বড় অংশ ফেলে দিতে হয়। তার পরিবারের একদিনের ফেলে দেওয়া খাবার দিয়েই জুলফাদের পরিবার সপ্তাহ চলতে পারত।
মাজারে মানত শেষ করে বৈশাখি তাদের বিক্রির জিনিসপত্র নিয়ে বসে বাজারে। একটি পুরানো চটের বস্তার উপর মেলে ধরে চুড়ি, ফিতা, আর কিছু পুরানো সাজসজ্জার জিনিস। কিছুক্ষণ পর তাদের মা মান্নাতও এসে যোগ দেয় – তিনিও হাড্ডিসার, চোখ বসে গেছে। জুলফা তার পুরানো প্রাণবন্ততার ছোঁয়া নিয়ে ঘুরতে থাকে বাজারজুড়ে। যাত্রাপালা বন্ধ থাকলে সে মাঝেমধ্যে মা-ভাবির সঙ্গে বের হয়। বোন জুঁই ভাইয়ের সঙ্গে থাকে বেশিরভাগ সময়।
পাশের গ্রামে বিয়ের দাওয়াতে এসেছে শব্দর। সে বাজারে গিয়ে গাবুকে কানে কানে কিছু বলে। গাবু শব্দরের নির্দেশমতো বৈশাখির কাছ থেকে সব জিনিসপত্র কিনে নেয়, দামও দেয় অনেক বেশি। বৈশাখি, মান্নাত অবাক হয়ে তাকায়, কোনো প্রশ্ন করে না। শুধু কৃতজ্ঞতায় হাত জোড় করে।
এই ঘটনার মাস কয়েক পর দেশের অবস্থা অনেকটাই ভালো হয়ে ওঠে। ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের কালো ছায়া ক্রমশ দূর হতে থাকে। মানুষের মুখে আবার হাসি ফোটে, বাজারে খাদ্যদ্রব্যের সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে আসে। গ্রামাঞ্চলে আবার শুরু হয় নানারকম উৎসব-অনুষ্ঠান। যাত্রাপালার নাচগানের আয়োজন হতে থাকে বিভিন্ন স্থানে। দুঃসময়ে যে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়েছিল, তা আবার প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
শব্দর দীর্ঘদিনের কাজের চাপ আর মানসিক অবসাদ থেকে মুক্তি পেতে বিনোদনের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে। কালীগঞ্জের বিখ্যাত যাত্রাপালার আয়োজন হচ্ছে শুনে সে সেখানে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। যাত্রাপালা তখন গ্রামীণ জনপদের অন্যতম প্রধান বিনোদনের মাধ্যম। মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে এসে এই অনুষ্ঠান দেখে।
যাত্রার আয়োজন স্থলে পৌঁছানোর পর শব্দর শুনতে পায় জেসমিন নামের এক শিল্পীর অসাধারণ প্রশংসা। লোকমুখে তার অভিনয় প্রতিভা, নৃত্যকলা আর সুমধুর কণ্ঠের বিস্তর তারিফ শোনা যায়। দর্শকরা বলাবলি করে যে এমন দক্ষ ও মোহনীয় শিল্পী বহুদিন দেখা যায়নি। তার অভিনয় আর নাচের ভঙ্গিমা নাকি মানুষকে সম্মোহিত করে ফেলে।
যাত্রা শুরু হওয়ার সাথে সাথেই মঞ্চে নায়িকা জেসমিনের আগমন ঘটে। তার মুখে পাতলা পর্দা থাকলেও শব্দর প্রথম দেখাতেই চিনে ফেলে তাকে! এ তো জুলফা! তার বিস্ময়ের সীমা থাকে না।
জুলফার নাচের প্রতিভা দেখে শব্দর নির্বাক হয়ে যায়। তার প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি মনোমুগ্ধকর! হাতের মুদ্রা, পায়ের তাল, কোমরের দোলা দর্শকদের সম্পূর্ণভাবে বিমোহিত করে ফেলে। মঞ্চের আলোয় তার চোখের দৃষ্টি আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ওই চোখ দিয়েই সে শ’খানেক পুরুষ একসঙ্গে ঘায়েল করে দিতে পারবে! তার নাচের, অভিনয়ের প্রতিটি ভঙ্গিমা এতই নিখুঁত যে মনে হয় যেন দেবী নৃত্য করছে।
পরপর কয়েকদিন জুলফার অভিনয় আর নাচ দেখে শব্দর সম্পূর্ণভাবে বিমোহিত হয়ে যায়। প্রতিদিন সে চাদরে মুখ ঢেকে সামনের সারিতে বসে অপলক তাকিয়ে থাকে জুলফার দিকে। তার মন ব্যাকুল হয়ে উঠে সাহসী, দয়ালু, প্রতিভাবান মেয়েটির সঙ্গ পাওয়ার জন্য। দীর্ঘদিন পর কোনো নারীর প্রতি তার মনে এমন তীব্র আকর্ষণ জাগে। জুলফার প্রতিটি নড়াচড়া চুম্বকের মতো টানে তাকে।
সেদিনই শব্দর গাবুকে পাঠায় যাত্রা প্রযোজকের কাছে। সাধারণত যাত্রার মেয়েরা অর্থের বিনিময়ে ধনী পুরুষদের মনোরঞ্জন করে থাকে – এটাই ছিল তখনকার প্রচলিত রীতি। শব্দরও সেই নিয়ম অনুযায়ী জেসমিনের কাছে তার প্রস্তাব পাঠায়। অর্থের বিনিময়ে অন্তত কয়েক রাত সে জুলফার সান্নিধ্য পেতে চায়।
গাবু ফিরে এসে শব্দরকে বিস্মিত করে দিয়ে জানায় যে জেসমিন অর্থের বিনিময়ে কোনো পুরুষের সাথে রাত কাটায় না। এই উত্তর শুনে শব্দর প্রথমে অবিশ্বাস করে। সে অর্থের পরিমাণ বাড়ানোর চেষ্টা করে, কিন্তু তাতেও কোনো ফল হয় না। জুলফা তার নীতিতে অটল থাকে।
প্রথমে শব্দর রেগে যায়। তার অহংকারে আঘাত লাগে। কিন্তু ক্রমশ সেই রাগ পরিবর্তিত হয়ে মুগ্ধতার অতল সাগরে পরিণত হয়। জুলফার নীতিবোধ, চরিত্রের সততা তাকে আরও বেশি আকৃষ্ট করে। মনে হয় যেন কয়লার স্তূপের মাঝে একটি হীরে খুঁজে পেয়েছে। এই হীরেটি তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলে মুগ্ধতার জালে, মায়ার জালে।
জুলফার চিন্তাভাবনা ক্রমশ শব্দরের পুরো মানসিকতা গ্রাস করে নেয়। দিনরাত তার মাথায় ঘুরতে থাকে জুলফার মুখ। সে বারবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখতে শুরু করে। বয়সের চিহ্ন খোঁজার চেষ্টা করে, নিজের চেহারা-সুরতের দিকে নতুন করে নজর দেয়।
একদিন গাবুকে অবাক করে দিয়ে প্রশ্ন করে, ‘হাবু, আমি কি বুড়ো হয়ে গেছি?’
গাবু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে উত্তর দেয়, ‘না হুজুর! আপনি এখনো দশটা বিয়ে করতে পারবেন!’
উত্তর শুনে শব্দর অত্যন্ত খুশি হয়। তার মনে আত্মবিশ্বাস ফিরে আসে। খুশি হয়ে সে গাবুকে দু’শো টাকা পুরস্কার দেয়।
তারপর থেকে শব্দর নিয়মিত জুলফার যাত্রাপালা দেখতে শুরু করে। গ্রামের মাঠে বসানো মঞ্চের সামনে, কেরোসিনের লণ্ঠনের আলোয় চাদর দিয়ে মুখের অর্ধেক ঢেকে সে বসে থাকে দর্শক সারিতে। জুলফার চারপাশে কোনো পুরুষকে একটু বেশি ঘেঁষতে দেখলেই তার বুকের ভেতর একটা জ্বালা ধরে যায়। খুব দ্রুতই সে বুঝতে পারে, তার হৃদয়পাড়ায় কিছু একটা গণ্ডগোল হচ্ছে। প্রথমদিকে যেটা ছিল শুধুই গুণমুগ্ধতা আর সৌন্দর্যে বিমোহিত হওয়া। রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ কোনো সুন্দর শিউলি ফুলের গাছ চোখে পড়লে যেমন পা এমনিতেই থমকে যায়, মন ভরে যায় – ঠিক তেমনি জুলফার গুণে, তার সৌন্দর্যে তার মন আটকে গিয়েছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে এই মুগ্ধতা আরও গভীর হতে শুরু করেছে। দিনের পর দিন জুলফাকে নিয়ে ভাবতে গিয়ে মুগ্ধতা তার রূপ পাল্টেছে। রাতে ঘুমের মধ্যে জুলফার বড় বড় কালো চোখ দুটো তার স্বপনে ভেসে ওঠে। সকালে ঘুম ভেঙে মনে পড়ে, ‘কখন সন্ধ্যা হবে, কখন পালা দেখতে যাব।’
যে জুলফাকে আগে শুধু দূর থেকে দেখতে চাইত, এখন তাকে সব বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করতে চায়, যত্ন করতে চায়। এই অনুভূতি আর নিছক মুগ্ধতা নয়, এটা মরণব্যাধি প্রেম।
সপ্তাহখানেক পালা বন্ধ থাকায় একদিন সন্ধ্যাবেলা জুলফাকে দেখার জন্য তার মন প্রচণ্ড অস্থির হয়ে ওঠে। বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। আকাশ যেন তার সব জল একসাথে ঢেলে দিচ্ছে মাটিতে। কালো মেঘে আকাশ ঢেকে গেছে, হাওয়া বইছে ঝোড়ো। এমন প্রতিকূল আবহাওয়াও তার অস্থিরতাকে টলাতে পারে না। একটা পুরনো কালো ছাতা হাতে নিয়ে সে বেরিয়ে পড়ে সোনামুখি নদীর তীরের দিকে। কাদা-মাটির রাস্তা, জল জমে আছে জায়গায় জায়গায়। বৃষ্টির তীব্র দাপটে তার সাদা পাঞ্জাবির বেশিরভাগ অংশ এবং সাদা পায়জামার অনেকটা ভিজে যায়। তাতে তার যায় আসে না। তার একমাত্র উদ্দেশ্য জুলফার দেখা পাওয়া। নদীর তীরে পৌঁছে সে একটি বড় আমগাছের আড়ালে আশ্রয় নেয়। চারিদিকে তাকিয়ে দেখে, কোথাও কেউ নেই। সন্ধ্যার অন্ধকার ধীরে ধীরে চারদিকে নেমে আসছে। সব বেদে পরিবার তাদের নৌকার ভেতর ঢুকে পর্দা ফেলে রেখেছে।
শব্দর চলে যাওয়ার উপক্রম করতেই জুলফা তার ভাতিজাকে কোলে নিয়ে নৌকার গলুই থেকে পা রাখে কর্দমাক্ত পাড়ে। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে খিলখিলিয়ে হাসে দুজন৷
এতদিন তাকে কেবল ঘাগড়া-চোলিতেই দেখেছে শব্দর! আজ সে নীল রঙের উপর কালো কারুকাজ করা একটি শাড়ি পরেছে, যার সাথে মানানসই কালো রঙের ব্লাউজ। মাস কয়েক ধরে নিয়মিত যাত্রাপালায় অংশগ্রহণের কারণে সে অধিকাংশ সময় ঘরের ছায়াতলেই অবস্থান করে। প্রখর সূর্যালোক আর বর্ষার রুদ্র স্পর্শ থেকে দূরে থাকার ফলে তার দেহের বর্ণও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। রূপ-লাবণ্যে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে মেয়েটা! কোনো বেদেকন্যা কেন এতো আকর্ষণীয় হবে? শব্দর মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকে।
হঠাৎ করেই নৌকার ভেতর থেকে তার মা মান্নাত বেরিয়ে আসেন। দ্রুত এগিয়ে এসে ছোট শিশুটিকে ছোঁ মেরে টেনে নিয়ে নৌকার ভেতরে চলে যান। জুলফা মুখ ভার করে কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর দুই হাত আকাশের দিকে প্রসারিত করে নিজের মনেই ঘুরতে শুরু করে৷ হঠাৎ তার পা পিছলে যায়, চিৎপটাং হয়ে পড়ে কাদা-পানিতে ভেজা মাটিতে। মুহূর্তেই তার মুখে লজ্জা ফুটে ওঠে। সে দ্রুত চারপাশে তাকিয়ে দেখে কেউ তার এই বিব্রতকর অবস্থা প্রত্যক্ষ করেছে কিনা। তার এই সতর্ক দৃষ্টিতে এদিক-ওদিক তাকানোর সরল ভঙ্গি দেখে গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকা শব্দর হেসে ওঠে৷ হাসির তীব্রতায় মুখ চেপে ধরে৷ আকাশ থেকে বৃষ্টি তখনও ঝমঝমিয়ে ঝরে পড়ছে তার ছাতার উপর।
এতটুকু বলেই শব্দর ‘হোহো’ করে উচ্চস্বরে হেসে ওঠে। লতিফও তার সাথে সুর মিলিয়ে হাসতে থাকে। দুই বন্ধুর আনন্দময় মুহূর্তে, স্মৃতিচারণের আবেগে মগ্ন থাকতে থাকতে তারা কেউই লক্ষ্য করে না যে দেয়ালের ওপাশে, ঠিক তাদের কথোপকথন শোনার মতো দূরত্বে, নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে জুলফা। সে এসেছিল শব্দরকে বলতে, আজ বাইরে যেতে চায়৷ দেয়ালের কাছে এসেই শুনতে পায় তাকে নিয়েই আলোচনা চলছে। কৌতূহলবশত সে দাঁড়িয়ে থাকে।
তাহলে সেই দিনের সেই দয়ালু মানুষটা, যে তাদের সব চুড়ি-ফিতা, আলতা-সিঁদুর, খেলনা আর নানা রকম সাজসজ্জার জিনিসপত্র কিনে নিয়েছিল, সেটা শব্দর ছিল!
স্মৃতির পাতা উল্টে মনে পড়ে যায় সেই ভয়াবহ দিনগুলোর কথা। একটানা কয়েক মাস ধরে দুর্ভিক্ষ চলছিল দেশজুড়ে। আকাল পড়েছিল। ধানের দাম আকাশছোঁয়া, চালের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। চারদিকে হাহাকার। মানুষজন অভুক্ত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। তাদের অবস্থা ছিল আরও করুণ। বেদে জীবনে খদ্দের একদমই ছিল না। কে কিনবে চুড়ি-ফিতা, কে কিনবে আলতা-সিঁদুর যখন পেটে দানা নেই, ঘরে চাল নেই! যাদের নিজেদের খাওয়ার ব্যবস্থা নেই, তারা কেন কিনবে সৌন্দর্যের উপাদান! দিনের পর দিন শুধু পানি খেয়ে দিন কাটিয়েছে তারা। কখনো সখনো ধনীদের দয়ায় এক মুঠো ভাত জুটেছে। এভাবে অনাহারে, অর্ধাহারে কাটছিল দিনগুলো। ঠিক সেই নরকতুল্য সময়ে, সেই যন্ত্রণাদায়ক দিনগুলোতে হঠাৎ করে একজন ভদ্রলোক এসে তাদের সব মাল কিনে নিয়েছিল। শুধু তাই নয়, দাম চাওয়ার চেয়ে বেশি টাকাও দিয়ে গিয়েছিল। সেদিন কত দিন পর তারা পেটভরে ভাত খেয়েছিল! মাছ-তরকারি দিয়ে পেট পুরে খেয়েছিল। সেই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের মধ্যে সেদিনটি ছিল তাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ দিনগুলোর একটি। মরুভূমিতে হঠাৎ পানির কূপ পাওয়ার মতো, অন্ধকার রাতে আলোর মশাল পাওয়ার মতো ছিল সেই ঘটনা! সেই দয়ালু, সেই উদার মানুষটিই কিনা তার স্বামী! জুলফার ঠোঁটে হাসি ফুটে ওঠে। সে অনেকক্ষণ যাবত ধরেই নিজের অজান্তে মিটিমিটি হাসছিল৷
লতিফ হাসি থামিয়ে ধীরে ধীরে গম্ভীর হয়ে গলার স্বর নামিয়ে বলে, ‘প্রেম-ভালোবাসার মতো ব্যাপার ত আর ডাকসাইট কিছুর মধ্যে পড়ে না। এমনি এমনিই হয়ে যায়। কিন্তু বিয়ে-শাদির ব্যাপারটা তো সম্পূর্ণ নিজের হাতে। যদি সমাজ-টমাজ, উঁচু-নিচু, জাত-পাত এইসব কিছু না থাকত, তাহলে যে আমি… আমি কি আর সুলেখাকে ছাড়তাম? তুই-ই তো আমাকে বুঝিয়েছিলে যে বংশ-মর্যাদা দেখে বিয়ে করতে হয়। অন্য ধর্মের, অন্য জাতের মেয়েকে বিয়ে করলে সমাজে সম্মান-মর্যাদা সব শেষ হয়ে যায়। পরিবারের নাম ডুবে যায়। তাই তো আমি পিছিয়ে গিয়েছিলাম। সেই তুই কেন এই ঝুঁকি নিলি?’
বেশ কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে শব্দর বলে, ‘আমি তখনও স্বপ্নেও ভাবিনি যে জুলফার কাছে মনের কথা বলব কিংবা ও’কে বিয়ে করব। ভূঁইয়া বাড়ির ছেলে, জমিদার পুত্র হয়ে একজন বেদেকন্যাকে বিয়ে করার মতো এত বড় দুঃসাহস দেখানোর কথা তো দূরের বাত, চিন্তাও করতে পারিনি। শুধু মনে মনে একটা গোপন অনুভব হিসেবে ওকে লালন করেছি। ঘুণাক্ষরেও বিয়ের চিন্তা মাথায় আনিনি। কিন্তু একদিন…’
—


![মেঘের দেশে প্রেমের বাড়ি [শেষ পর্ব]](https://amarlekha.com/wp-content/uploads/2025/10/3cf51236-2d29-45c2-a963-4d58a217fde2.jpg)
![অটবী সুখ [পর্ব-০১]](https://amarlekha.com/wp-content/uploads/2025/11/aa823019-ffef-4aa7-9651-89294bd4fbe2.jpg)
![প্রজাপতি আমরা দুজন [পর্ব-০৮]](https://amarlekha.com/wp-content/uploads/2025/07/photo_6212761625384044921_y.jpg)