নবোঢ়া: আগুনফুলের আত্মনিবেদন [পর্ব ৫৫]

রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে শব্দরের পায়ের শব্দ মৃদু গুঞ্জন তুলছে ধানের ক্ষেতের আইলে। দ্রুত বাড়ি পৌঁছাতে সড়কের পথ ছেড়ে সে বেছে নিয়েছে সংকীর্ণ মাটির পথ৷ আকাশের বুকে চাঁদ তখন পূর্ণিমার কাছাকাছি, তার রুপালি আলো যেন স্বর্গ থেকে নেমে এসে পৃথিবীর বুকে এক অলৌকিক জাল বিছিয়ে দিয়েছে। অথচ সেই সৌন্দর্য শব্দরের চোখে ধরা পড়ছে না। তার দৃষ্টি আটকে আছে সামনের অন্ধকারে। আইলের মাটি দিনের ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে ভিজে পিচ্ছিল হয়ে আছে। মাঝেমধ্যে তার পা হড়কে যাচ্ছে, এবং প্রতিবারই নিজেকে সামলে আবার হাঁটছে। চারদিকে বয়ে যাওয়া শীতল হাওয়ার শীতলতাও গায়ে লাগছে না। বুকের ভেতরে যেন একটা আগুনের চুল্লি জ্বলছে। সন্দেহের আগুন, ক্রোধের আগুন, হতাশার আগুন সবকিছু মিলে দাবদাহ সৃষ্টি করেছে যা তার পুরো শরীর ও মনকে গ্রাস করে ফেলেছে।

জুলফা এত দূর, সোনাকান্দা কার সঙ্গে গিয়েছিল? — প্রশ্নটা তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে একটা ভীতিকর চক্রাকারে। প্রতিবার এই চিন্তা আসার সাথে সাথে বুকের ভেতর একটা টান অনুভব হচ্ছে, যেন কেউ তার হৃদয়টাকে মুষ্টিবদ্ধ হাতে চেপে ধরেছে।

ইদানীং তার আর জুলফার মধ্যেকার দূরত্বটা শুধু মানসিক না, শারিরীকও। সে জুলফাকে তার মতো থাকতে দিয়েছে, আগের মতো টেনে নেয় না বুকে। এই সুযোগে কোনো প্রেমে জড়ায়নি তো জুলফা? চিন্তাটা মনে আসতেই সে একটা বিদ্যুৎ স্পর্শ পায়।

অল্প বয়সী নারীর হৃদয় যদি স্বামীর দিকে না থাকে, তাহলে তা কোথায় ছুটে যায়? কোন অজানা পথে, কোন অচেনা মুখের দিকে?

শব্দরের কপাল ভিজে উঠে ঘামে। সে পাঞ্জাবির পকেট থেকে রুমাল বের কপাল মুছে। রুমালের স্পর্শে মুখের উষ্ণতা আরও বেশি করে টের পায়। তার গাল এবং কপাল আগুনের মতো গরম হয়ে আছে। হঠাৎ করে সামনে দিয়ে একটা শেয়াল বিদ্যুৎ গতিতে ছুটে যায়। শব্দর আঁতকে ওঠে৷

গ্রামের মানুষদের বিশ্বাসমতে, রাতের বেলা শেয়াল দেখা মানে আসন্ন বিপদের ইঙ্গিত। সে কুসংস্কারে বিশ্বাসী নয়৷ কিন্তু কেন যেন আজ অস্বস্তি হচ্ছে।

কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে হাঁফিয়ে নিয়ে সে আবার হাঁটা শুরু করে। আইল ছেড়ে সড়কে উঠতেই দূর থেকে ঘোড়ার খুরের শব্দ এবং গাড়ির চাকার আওয়াজ কানে আসে। চাঁদের আলোতে দেখা যায় ওমর ঘোড়াগাড়ি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সামনে। ঘোড়া দুটোর কালো চামড়া চাঁদের আলোতে চকমক করছে।

শব্দর পেছন থেকে উচ্চস্বরে ডাকে, ‘ওমর!’

ওমর চমকে ওঠে। হাত থেকে চাবুক পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। ঘোড়ার খুর কচমচিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। সে দ্রুত পেছনে তাকায়। দেখে শব্দর রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন। তার চোখ বড় বড় হয়ে যায়। মনে মনে ভাবে, ‘এইটা কেমন কথা! আমি তো হুজুরকে আনতে যাইতেছিলাম। উনি সামনে না থাইকা পেছনে কেমনে?’

মনে ভয় ছোবল মারে। গ্রামের মানুষের মনে নানান কুসংস্কার থাকে। রাতের বেলা হঠাৎ করে কেউ এভাবে দেখা দিলে প্রথমেই ভূত-পেতনীর কথা মনে আসে। ওমর ঘোড়াগাড়ি ঘুরিয়ে শব্দরের দিকে এগিয়ে যায়। কাছে এসে দেখে, চাঁদের উজ্জ্বল আলোতে মাটিতে শব্দরের ছায়া পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। কালো, স্পষ্ট ছায়া। চাঁদের আলো এত তীব্র যে দিনের মতোই ছায়া পড়েছে মাটিতে।

ওমরের বুক থেকে একটা বড় বোঝা নেমে যায়। মনে মনে বলে, ‘আলহামদুলিল্লাহ! ছায়া আছে। ভূত হইলে তো ছায়া থাকে না। মুরব্বিরা কয়, ভূত-পেতনীর ছায়া হয় না।’

তবুও মনের ভয় একেবারে কাটে না। আরেকবার ভালো করে দেখে নেয়। পায়ের কাছে মাটিতে ছায়া পড়ে আছে। গাছের পাতার ছায়ার সাথে শব্দরের ছায়া মিশে গেছে। চাঁদের আলোতে সব ছায়াই কালো আর স্পষ্ট। না, এ ভূত না। গাড়ি থেকে নেমে ওমর সালাম দেয়।

‘আসসালামু আলাইকুম, হুজুর। আপনি এইখানে কেন? আমি তো আপনারে আনতে যাইতেছিলাম।’

শব্দর কোনো কথা না বলে গাড়িতে উঠে বসে। আদেশের সুরে বলে, ‘দ্রুত বাড়ি চল।’

গ্রামের রাস্তায় এখন আর তেমন কেউ নেই। অন্ধকারে কয়েকটি বাড়িতে কেরোসিন বাতির হলুদাভ আলো জ্বলে উঠেছে, যা দূর থেকে দেখতে জোনাকির মতো লাগে। কয়েক মাইল দূরের গ্রামে বিদ্যুতের আলো এসে গেছে কবেই। এই গ্রামেও নাকি কিছুদিনের মধ্যে বিদ্যুৎ আসবে – এমন গুঞ্জন চলছে গত দেড় বছর ধরে। কিন্তু আসার কোনো লক্ষণই নেই।

গাড়িটি অল্পক্ষণের মধ্যেই গন্তব্যে পৌঁছে যায়। শব্দর তাড়াতাড়ি গাড়ি থেকে নেমে খাসমহলের দিকে হাঁটতে থাকে। খাসমহলের দরজার কাছে মনির দাঁড়িয়ে ছিল। শব্দরকে দেখেই সালাম দিয়ে বলে, ‘হুজুর, আপনার এক বন্ধু এসেছিলেন।’

শব্দর থেমে যায়। তার কপালে ভাঁজ পড়ে, ‘বন্ধু?’

‘জি হুজুর, কালীগঞ্জ থেকে। বেশ লম্বা মানুষ, দাড়িতে হালকা পাক। ভদ্রলোক বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেছেন।’

‘চলে গেছে?’

‘জি। বলে গেছেন কাল সকালে আবার আসবেন।’

‘ঠিক আছে।’

শব্দর দ্রুত দ্বিতীয় তলায় ওঠে। নিজের ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। গভীর শ্বাস নিয়ে মনটাকে শান্ত করার চেষ্টা করে। তারপর দরজায় মৃদু টোকা দেয়।

জুলফা দরজা খুলে। মুখে তার স্বভাবসুলভ হাসি। লম্বা কালো চুলগুলো খোঁপা করে বাঁধা। পরনে নীল পাড়ের কালো শাড়ি। মিষ্টি গলায় বলে, ‘এলেন।’

শব্দর জুলফার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায়। তার চোখে কোনো অস্বাভাবিকতা আছে কি না তা খোঁজার চেষ্টা করে। জুলফা এতে সামান্য অস্বস্তি বোধ করে।

শব্দর ঘরের ভেতর ঢুকে পাঞ্জাবি খুলতে শুরু করে। পিঠের দিকে আটকে যেতেই জুলফা স্বাভাবিকভাবেই এগিয়ে এসে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। শব্দর আলমারি খুলতে খুলতে অদ্ভুত ঠাণ্ডা গলায় জিজ্ঞেস করে, ‘সোনাকান্দা কেন গিয়েছিলে?’

জুলফা খাবার তৈরি করার জন্য বেরিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ এই প্রশ্নে সে থমকে দাঁড়ায়। চোখমুখ চুপসে যায়। ঘাড় ঘুরিয়ে অবাক হওয়ার ভান করে বলে, ‘কোথায়?’

শব্দর একই ঠাণ্ডা স্বরে পুনরাবৃত্তি করে, ‘সোনাকান্দা।’

জুলফা জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করে, ‘সোনাকান্দা!’

সে ইতস্ততভাবে ঠোঁট কামড়ে ভিজিয়ে নেয়। শব্দরের প্রশ্নের ধরন দেখে মনে হচ্ছে, সে নিশ্চিত হয়েই এই কথা বলছে। নাভেদকে কি তাহলে দেখে ফেলেছে? এই ভাবনায় তার বুকের ভেতরে তীব্র তোলপাড় শুরু হয়।

শব্দর আরও কঠিন স্বরে বলে, ‘বলো। কেন গিয়েছিলে?’

জুলফা তাৎক্ষণিক উত্তর দেয়, ‘সোনাকান্দার রসগোল্লার অনেক খ্যাতি শুনেছি। খেতে মন চাইছিল, তাই গিয়েছিলাম।’

‘মনির ছিল না? আমি ছিলাম না? বাড়িতে কাজের লোকের অভাব? এনে দিতে পারত না? কার সঙ্গে গিয়েছিলে?’

শেষ বাক্যটা প্রায় ধমকের সুরে বলে। জুলফা ভেতরে ভেতরে কেঁপে ওঠে। ভয়ে চটজলদি বলে, ‘শঙ্খিনী আর আমি।’

কিছুক্ষণ নীরবতার পর শব্দর আবার প্রশ্ন করে, ‘সঙ্গে আর কেউ ছিল না?’

‘আর কে থাকবে? আমরা দুজনই তো গিয়েছিলাম।’ জুলফা যতটা সম্ভব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছে।

শব্দর জুলফার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। সে বুঝতে চাইছে জুলফা সত্যি বলছে নাকি মিথ্যে। সেলিম তাহলে কেন ভেবেছিল, সেও ছিল? যদি কোনো পুরুষ না থাকে তাহলে এই ভুল বোঝাবুঝি কেন হয়েছে?

শব্দর আরেকবার জিজ্ঞেস করে, ‘নিশ্চিত বলছ? কোনো পুরুষমানুষ ছিল না সঙ্গে?’

‘না তো! পুরুষমানুষ কোথা থেকে আসবে?’ জুলফা একটু রাগের ভঙ্গিতে বলে। তারপর হঠাৎ যেন মনে পড়ে, ‘ওহ, হ্যাঁ! ভ্যানে করে তো গিয়েছিলাম। ভ্যানওয়ালা, দোকানদার – কত পুরুষমানুষই তো ছিল চারপাশে। আপনি আসলে কার কথা জিজ্ঞেস করছেন? কেন আমাকে সন্দেহ করছেন?’ বলতে বলতে জুলফার চোখে জল এসে যায়। চোখের কোণে অশ্রু জমে ওঠে।

জুলফার চোখে জল দেখে শব্দর কিছুটা দ্বিধায় পড়ে যায়। নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করে বলে, ‘সন্দেহের কথা কোথা থেকে এলো? তুমি আমাকে না জানিয়ে বাইরে গেলে আমি প্রশ্ন করতেই পারি। এ বাড়ির বৌয়েরা বাড়ির বাইরে যেতে হলে অনুমতি নেয়। আমি তোমাকে প্রথম থেকেই স্বাধীনতা দিয়েছি। কিন্তু তাই বলে এত দূর সোনাকান্দা পর্যন্ত চলে যাবে?’

ব্যাপারটা যেন বড় আকার না নেয় তাই চতুরতার সাথে জুলফা মাথা নিচু করে বিনীতভাবে বলে, ‘আমার ভুল হয়েছে। দোষ আমার। ক্ষমা করুন। আর কখনো এমন করব না। আপনি যদি বলেন, ঘর থেকেও বের হব না।’

শব্দর কয়েক মুহূর্ত জুলফার দিকে তাকিয়ে থেকে কিছু না বলে গোসলখানার দিকে চলে যায়। মনে মনে ভাবে, হয়তো মিছেমিছিই সন্দেহ করছি! জুলফা বলেছে, ‘আপনি চাইলে ঘর থেকেও বের হব না!’ কেউ স্বামী ছাড়া অন্য কারো প্রেমে পড়ে থাকলে কি এভাবে বলতে পারে? প্রেমে পড়া নারীরা সাধারণত বেপরোয়া হয়, উশৃঙ্খল হয়। জুলফার মধ্যে তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এই ভেবে কিছুটা স্বস্তি পেয়ে সে গোসল সেরে খাবার ঘরে গিয়ে বসে অভ্যাসবশত।

শঙ্খিনী খাবার নিয়ে এসে পরিবেশন করতে থাকে। শব্দর হঠাৎ জিজ্ঞেস করে, ‘তুই আজ কোথাও গিয়েছিস?’

শঙ্খিনী একটু অবাক হয়ে তাকায়। তারপর মাথা নত করে বলে, ‘না হুজুর, কোথাও যাইনি।’

‘সেকি! বেগম সাহেবা আজ বের হননি?’

প্রশ্নটা শুনে শঙ্খিনী দ্বিধায় পড়ে যায়। কী বলবে? বেগম সাহেবা গেছেন নাকি যাননি? কীভাবে উত্তর দেবে? একটু ভেবে সে নিরপেক্ষ উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করে।

‘হুজুর, আজ বেগম সাহেবার সাথে তেমন দেখাসাক্ষাৎ হয়নি। তাই ঠিক বলতে পারছি না।’

শব্দর হাত নাড়িয়ে চলে যেতে বলে। শঙ্খিনী সালাম করে তাড়াতাড়ি চলে যায়। সে খেয়াল করে না, শব্দরের ঠোঁট দুটো শক্ত হয়ে, চোখ সংকুচিত হয়ে এসেছে। দুজন দুই রকম কথা কেন বলেছে?

জুলফা নিচে নেমে দেখে শব্দর না খেয়েই হাত ধুয়ে উঠে যাচ্ছে। সে উৎকণ্ঠিত হয়ে বলে, ‘কী ব্যাপার খাচ্ছেন না কেন?’

শব্দর বৈঠকখানার দিকে যেতে যেতে বলে, ‘খেয়ে এসেছিলাম, মনে ছিল না৷’

‘ঘুমাবেন না?’

‘কিছুক্ষণ পর। তুমি গিয়ে শুয়ে পড়ো।’

জুলফা একজন দাসীকে খাবার-দাবার গোছাতে বলে উপরে চলে যায়৷ কোনো এক অজানা কারণে তার বুক ধড়ফড় করছে।

ভোরের সোনালী আলো জানালার ফাঁক গলিয়ে ধীরে ধীরে ঘরে প্রবেশ করে। প্রথমে মেঝেতে একটা সরু আলোর রেখা, তারপর সেই রেখা বিস্তৃত হয়ে পুরো ঘরটাকে উজ্জ্বল করে তোলে। শব্দরের মুখে আলোর ছোঁয়া লাগতেই তার ঘুম ভেঙে যায়। চোখ খুলে প্রথমে একটু অস্পষ্ট দেখে, তারপর ধীরে ধীরে সবকিছু পরিষ্কার হয়ে ওঠে। আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসে। গলায় সামান্য ব্যথা, পিঠটাও একটু কষে উঠেছে। রাতে বইপত্র নিয়ে বসেছিল, কখন যে টেবিলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে মনেই নেই। বাইরে পাখিদের কিচিরমিচির শব্দ।

উঠে গিয়ে ঠাণ্ডা পানিতে হাত-মুখ ধোয়। আয়নায় নিজেকে দেখে, চুল এলোমেলো, চোখে ঘুমের চিহ্ন। চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়ে, পাঞ্জাবির বোতাম ঠিক করে। বারান্দায় এসে উঁকি দিয়ে দেখে জুলফা চেয়ারে বসে আছে। বাগানের দিকে তাকিয়ে আছে। মুখে বিষণ্ণ ভাব।

শব্দর গলা পরিষ্কার করে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলে, ‘বাড়ি থেকে বেরোবে না।’

জুলফা চমকে ফিরে তাকায়। কিছু বলতে যাচ্ছিল, শব্দর ততক্ষণে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেছে।

বৈঠকখানার দিকে যেতে গিয়ে দেখে কেউ একজন বসে আছে। পেছন ফিরে বসে, তাই চিনতে পারে না প্রথমে। শব্দর এগিয়ে যায়। গায়ে নীল শার্ট, কালো প্যান্ট। চুল একটু পেছনে আঁচড়ানো। মানুষটা ঘুরে তাকায়।

‘লতিফ!’

শব্দরের মুখের হাসিটা দেখার মতো হয়। চোখ দুটো চকচক করে ওঠে।

লতিফও লাফিয়ে উঠে দাঁড়ায়। তার মুখেও একই রকম উজ্জ্বলতা। ‘শব্দর! আরে পাগলা!’

দুজনে একসাথে এগিয়ে যায়। কোলাকুলি করে। দুজনের চোখেই আনন্দের অশ্রু। লতিফ শব্দরের পিঠে এমন জোরে চাপড় মারে যে শব্দর কেশে ওঠে, ‘আহ!’ তারপর পরই হেসে ফেলে।

লতিফ একটু পিছিয়ে গিয়ে শব্দরকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখে নেয়। বলে, ‘বুকটা শীতল হয়ে গেল রে ভাই! এত বছর পর দেখা! তুই তো একদম সেই রকমই আছিস।’

‘বস বস!’ শব্দর দাসীকে ডাকে, ‘কে আছিস? দুটো চা নিয়ে আয় জলদি!’

দুজন পাশাপাশি সোফায় বসে। দুজনেই একসাথে কথা বলতে শুরু করে –

‘তুই কবে এলি? কেমন…’

‘তোর দেখা পাওয়ার জন্য…’

তারপর থেমে হেসে ফেলে দুজনেই।

‘তুই আগে বল!’ শব্দর হাসতে হাসতে বলে।

‘তুই বল! কেমন আছিস?’

‘বেশ আছি। তোর খবর কী? কলকাতা কেমন লাগছে? ব্যবসা কেমন চলছে? কতগুলো চিঠি লিখেছি গুণে দেখেছিস? একটা উত্তরও দিলি না! ভাবলাম বুঝি বন্ধুত্বটা ভুলে গেছিস।’

লতিফের মুখটা একটু গম্ভীর হয়ে যায়। এর মধ্যে চা এসে গেছে। কাপে চুমুক দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ‘কী যে ঝামেলায় পড়েছিলাম! ব্যবসাটা একদম ডুবে যাওয়ার জোগাড় হয়েছিল। রাত-দিন একাকার হয়ে গিয়েছিল। কোথায় চিঠি লেখা, কোথায় বন্ধুবান্ধব – দুনিয়াটাই অসহ্য লাগত সেই সময়টাতে।’

‘কী হয়েছিল?’

লতিফ তার সব দুঃখের কাহিনী বলতে শুরু করে। হাতে কাপ ধরে রেখে, মাঝে মাঝে চুমুক দিতে দিতে বলে যায়।

‘আমি একটা পার্টনারশিপ ব্যবসা করেছিলাম। কাপড়ের ব্যবসা। একজন পার্টনার ছিল, খুব বিশ্বস্ত মনে হত। কিন্তু সেই শয়তান একদিন সব টাকা-পয়সা নিয়ে গায়ব হয়ে গেল। পরে জানতে পারলাম সব কাগজপত্রে আমার সই নকল করে রেখেছিল।’

শব্দর মনোযোগ দিয়ে শুনছে।

‘তারপর?’

‘তারপর আর কী! মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়ে পড়লাম। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছিলাম, সেগুলো শোধ করতে পারছিলাম না। বাড়ি-ঘর সব বিক্রি করে দিতে হলো। এক সময় মনে হচ্ছিল আর পারব না।’

‘বউ-বাচ্চারা কোথায় ছিল?’

‘বাপের বাড়িতে চলে গিয়েছিল। আমি একা শহরে থেকে কোনোমতে টিকে থাকার চেষ্টা করছিলাম। রাতে ঘুম আসত না, খেতেও ইচ্ছা করত না।

তারপর আল্লাহর মেহেরবানিতে ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে গেল। একটা আত্মীয় সাহায্য করল। নতুন একটা ব্যবসা শুরু করেছি। এখন আলহামদুলিল্লাহ ভালোই চলছে। পরিবারও আবার একসাথে।’

‘আলহামদুলিল্লাহ!’ শব্দর খুশিতে লতিফের হাত চেপে ধরে। লতিফ বলে, ‘তোর কী অবস্থা বল? সব কিছু ঠিকঠাক তো? এতদিন পর বিয়ে করতে ইচ্ছা হলো? আমি তো ভেবেছিলাম তুই আর বিয়ে করবিই না!’

শব্দর একটু লজ্জা পেয়ে হাসে, ‘এই হয়ে গেল। ভাবিকে দেখেছিস? এই ফজিলা…’

লতিফ তাড়াতাড়ি থামিয়ে দিয়ে বলে, ‘গতকাল এসেছিলাম, কথা হয়েছে।’ কথা বলতে গিয়ে লতিফের মুখের হাসিটা একটু মলিন হয়ে যায়। ভ্রু কুঁচকে যায়।

শব্দর লক্ষ্য করে না। উৎসাহের সাথে বলে, ‘আমার সামনে তো কোনো কথা হয়নি। দাঁড়া, আমি ওকে ডেকে আনছি। তোদের আরও ভালো করে পরিচয় করিয়ে দিই। তুই আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু, আর জুলফা…’

‘না না, থাক! দরকার নেই।’ লতিফ কিছুটা তাড়াহুড়ো করে বলে। ‘উনি অস্বস্তিতে পড়বেন।’

‘অস্বস্তিতে কেন পড়বে?’ শব্দর অবাক হয়ে বলে। ‘আমার বউ, আর আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু – তোদের পরিচয় হওয়াটা তো স্বাভাবিক। আমি…’

শব্দর উঠতে যায়, কিন্তু লতিফ হাত ধরে টেনে বসিয়ে দেয়। একটু গম্ভীর গলায় বলে, ‘তুই আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু। ছোটবেলা থেকে যে কথা মনে এসেছে তাই বলেছি তোকে।’

শব্দর অবাক হয়ে তাকায়। লতিফের কণ্ঠস্বরটা অন্যরকম লাগছে। লতিফ একটু ইতস্তত করে। মনে হচ্ছে কোনো কঠিন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। তারপর সোজা শব্দরের চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘তুই কি জেনে-বুঝে এই বিয়েটা করেছিস?’

‘মানে?’ শব্দর ভ্রু কুঁচকায়।

‘তুই ভাবির পরিচয় জানিস?’ লতিফ অস্বস্তিতে নড়চড় করে বসে। এতদিন পর বন্ধুর সাথে দেখা, অথচ প্রথম দেখাতেই এমন একটা বিষয়ে কথা বলতে হচ্ছে যেটা খুব অস্বস্তিকর।

শব্দর প্রশ্নবোধক চোখে তাকিয়ে থাকে।

লতিফ মাথা নেড়ে বলে, ‘আমি জানি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে তুই জানিস কি না।’

‘কী জানব?’

‘এরকম গোত্রে কেন বিয়ে করলি ভাই? আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না! কীভাবে হলো এসব? কে ঠিক করল এই বিয়েটা?’

শব্দর এদিক-ওদিক তাকিয়ে দাস-দাসীদের উপস্থিতি লক্ষ্য করে। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিচু গলায় বলে, ‘নিজে পছন্দ করে বিয়ে করেছি।

  • Related Posts

    নবোঢ়া: আগুনফুলের আত্মনিবেদন [পর্ব ৬২]

    একটা ছোট মেয়ে। বয়স নয় কি দশ হবে। মাথাভর্তি উসকোখুসকো চুল। পরনের জামাকাপড়ে ময়লার পুরু আস্তরণ জমে আছে। কাঁধে ঝুলছে একটা মোটা পাটের বস্তা, যার প্রায় অর্ধেকটা ভরে গেছে হলদেটে…

    নবোঢ়া: আগুনফুলের আত্মনিবেদন [পর্ব-৬১]

    গুলনূরের চোখের কোণ বেয়ে নেমে আসা জলকণা গালের ওপর দিয়ে গড়িয়ে পড়ে একবিন্দু একবিন্দু করে। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, কষ্টের মাঝেও সে হাসছে! তার ঠোঁটের কোণ বিদ্রূপে ভরা। জাওয়াদের দিকে নির্ভীক…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    নবোঢ়া: আগুনফুলের আত্মনিবেদন [পর্ব ৬২]

    নবোঢ়া: আগুনফুলের আত্মনিবেদন [পর্ব ৬২]

    নবোঢ়া: আগুনফুলের আত্মনিবেদন [পর্ব-৬১]

    নবোঢ়া: আগুনফুলের আত্মনিবেদন [পর্ব-৬১]

    মেঘের দেশে প্রেমের বাড়ি [শেষ পর্ব]

    মেঘের দেশে প্রেমের বাড়ি [শেষ পর্ব]

    অটবী সুখ [পর্ব-০১]

    অটবী সুখ [পর্ব-০১]

    প্রজাপতি আমরা দুজন [পর্ব-০৮]

    প্রজাপতি আমরা দুজন [পর্ব-০৮]

    মেঘের দেশে প্রেমের বাড়ি [পর্ব-০৯]

    মেঘের দেশে প্রেমের বাড়ি [পর্ব-০৯]